আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবার ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির উদ্যোগ নিয়েছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ, নিপীড়ন, জোরপূর্বক জনসংখ্যা উচ্ছেদ এবং অবৈধ বসতি স্থাপনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা প্রস্তুত করা হয়েছে।
খবরে বলা হয়, আইসিসির প্রসিকিউটর দপ্তর গত মাসে গোপনে আদালতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন জমা দেয়। যদি আদালতের বিচারকরা এই আবেদন অনুমোদন করেন, তাহলে আন্তর্জাতিক কোনো আদালতে বর্ণবাদী নীতির অভিযোগে এটি হবে প্রথম উচ্চপর্যায়ের ইসরায়েলি নেতার বিরুদ্ধে পরোয়ানা।
একই সঙ্গে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগে মামলা প্রস্তুত রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তার বিরুদ্ধে এখনো আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা হয়নি।
এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। কারণ এর আগে আইসিসি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউয়াভ গালান্তের বিরুদ্ধে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের পর থেকেই ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের একটি অংশ আইসিসির বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নেয়।
নতুন অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অধিকৃত ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন অবৈধ হলেও স্মোটরিচ ও বেন-গাভির প্রকাশ্যে এসব বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের জমি দখল, চলাচলে বাধা এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদের মাধ্যমে সেখানে ‘দুই ধরনের আইনি ব্যবস্থা’ চালু করা হয়েছে, যা কার্যত বর্ণবাদী নীতির সামিল।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রাঞ্চেসকা আলবানেজ সম্প্রতি আইসিসিকে ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত নতুন কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেনি। সম্প্রতি ইসরায়েলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু খবরকে ভুল বলেও উল্লেখ করেছে আইসিসি।
অন্যদিকে ইসরায়েল সরকার এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তেল আবিবের দাবি, আইসিসি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করছে এবং ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। স্মোটরিচ ও বেন-গভির দুজনই অতীতে আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে ইসরায়েলবিরোধী প্রচারণা বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও আইসিসির ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির পর ওয়াশিংটন আদালতের কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা সামনে এলে যুক্তরাষ্ট্র–আইসিসি সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বর্ণবাদের অভিযোগ। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের পর আন্তর্জাতিক আইনে এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদি আইসিসি শেষ পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুমোদন করে, তাহলে তা শুধু ইসরায়েলের জন্য নয়, পুরো আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্যই বড় এক নজির হয়ে দাঁড়াবে।
সূত্র: রয়টার্স ও মিডল ইস্ট আই