গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষভাবে পরিচালিত’ হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন (ইইউ ইওএম)। সেই সঙ্গে তারা এ নির্বাচনকে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে এবং কোনো ধরনের ‘নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
রাজধানীর ইন্টার কন্টিনেন্টালে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইইউ ইওএম। এর আগে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি মিশনটি সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো নির্বাচনটি প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল এবং মৌলিক স্বাধীনতাগুলো মোটামুটি বজায় ছিল। তবে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা, অনলাইনে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য (ডিসইনফরমেশন) এবং কিছু ক্ষেত্রে ভয়ের পরিবেশ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আংশিকভাবে প্রভাবিত করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস নির্বাচনের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে ৯টি পর্যবেক্ষণ ও ১৯টি সুপারিশ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসরণ করে এ পর্যবেক্ষণ পরিচালিত হয়েছে এবং এমন কোনো অনিয়ম চোখে পড়েনি, যা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয়।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রশংসা করে ইইউ বলেছে, সংস্থাটি স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে কাজ করেছে এবং অংশীজনদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। নির্বাচন দিবস শান্তিপূর্ণ ছিল এবং ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ মোটামুটি স্বচ্ছ ছিল। জাতীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ফলাফল উন্মুক্ত করার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় সাত লাখ ৭০ হাজার প্রবাসী ভোটার ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন এবং আট লাখ ৫০ হাজারের বেশি নির্বাচন কর্মকর্তা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। তবে ফলাফল প্রকাশে ধীরগতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
নতুন আইনি কাঠামো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও তা এখনো খণ্ডিত এবং কিছু ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে আইন সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে ইইউ।
তারা বলছে, প্রচারণা পর্বে ব্যক্তিগত আক্রমণ, পারস্পরিক অভিযোগ ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ম থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ হয়নি এবং নজরদারি দুর্বল ছিল। এ প্রসঙ্গে ইজাবস বলেন, গণতন্ত্রে অতিরিক্ত অর্থের প্রভাব সীমিত রাখতে কঠোর ও কার্যকর আইন জরুরি।
অন্যদিকে নারী প্রার্থীর হার চার শতাংশেরও কম হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন ও অফলাইন সহিংসতার বিষয়ও উঠে এসেছে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়।
প্রায় পাঁচ লাখ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বিশ্লেষণ করে ২৩টি বিভ্রান্তিমূলক তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যা ফেসবুক ও টিকটকে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ছড়ানো হয়েছে। গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর চাপ, হয়রানি ও ডিজিটাল হামলার বিষয়ও প্রতিবেদনে উঠে আসে।
১৯টি সুপারিশের মধ্যে ছয়টি অগ্রাধিকার পেয়েছে—নির্বাচনী আইন সংস্কার, ফলাফল প্রকাশে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী আইন, নির্বাচনী অর্থায়নে নজরদারি জোরদার এবং ডাক ভোট ও বিকল্প ভোট ব্যবস্থা সম্প্রসারণ।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ডাক ভোট ব্যবস্থাকে ইতিবাচক বলা হলেও গোপনীয়তা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ও চলাচলে অক্ষম নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতেও এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ থাকলে আইনি প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রয়েছে এবং কিছু মামলা এখনো বিচারাধীন—এটিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ইইউ বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের প্রতিফলন। নির্বাচনটি প্রতিযোগিতামূলক, শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং ফলাফল ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল। ইভার্স ইজাবস বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়া শুধু ক্ষমতা নয়, এটি বড় দায়িত্বও।’
ইইউ পর্যবেক্ষক দলের মতে, নির্বাচন পরবর্তী কিছু আইনি চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া বজায় রয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
এ ছাড়া এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছে ইইউ ইওএম।