দেশের অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মসংস্থানমুখী করতে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট’ ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, গ্রামভিত্তিক উৎপাদন, সৃজনশীল শিল্প ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেই সরকার নতুন অর্থনৈতিক দর্শন বাস্তবায়ন করতে চায়।
শনিবার (১০ মে) রাজধানীতে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে রেইস প্রকল্পের কার্যক্রম, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সফলতা এবং সরকারের সামাজিক ও সৃজনশীল অর্থনীতি বিষয়ক পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদন হলেও সেগুলোর নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে উৎপাদকরা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বরিশালের শীতলপাটির কথা উল্লেখ করে বলেন, একই পণ্য আধুনিক ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বহুগুণ বেশি দামে বিক্রি সম্ভব।’
তিনি জানান, সরকার ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট’ কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ উৎপাদকদের ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইনিং সাপোর্ট, ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে প্রবেশের সুযোগ দেবে। অ্যামাজন, আলিবাবাসহ আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে দেশীয় পণ্য তুলে ধরারও পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, থাইল্যান্ডে এ ধরনের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন হতে তিনি নিজে দেখেছেন। সেখানে গ্রামের মানুষ ঘরে বসেই পণ্য উৎপাদন করছে, সরকার তাদের প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগ দিচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় সংগ্রহ ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে গুরুত্ব
সরকার এখন ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতিকে নতুন প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে দেখছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘শুধু শিল্পকারখানা বা ম্যানুফ্যাকচারিং নয়, থিয়েটার, সংগীত, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও কটেজ শিল্পও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘জিডিপি শুধু মিল-ফ্যাক্টরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। থিয়েটার, ডিজাইনিং, ফাইন ডাইনিং, সংস্কৃতি—সবকিছু মিলিয়েও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়।’
তার ভাষায়, বাংলাদেশের কামার, কুমার, তাঁতি ও কটেজ শিল্পে যুক্ত মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাজ করলেও জীবনমানের উন্নতি হয়নি। সরকার এখন এসব খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে চায়। এজন্য অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বাজার সংযোগে সহায়তা দেওয়া হবে।
‘প্রজেক্ট জাজ’ করার নতুন মানদণ্ড
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে নতুন কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে এখন চারটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশগত প্রভাব ও জনকল্যাণ।’
তিনি বলেন, ‘যে প্রকল্প জনগণের অর্থের যথাযথ মূল্য দেবে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না এবং পরিবেশগত বিবেচনা পূরণ করবে না, সেই প্রকল্প আমরা করবো না।’
তার মতে, অতীতে বড় বড় প্রকল্পে দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাই বর্তমান সরকার এখন মেগা প্রজেক্ থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সামাজিক কর্মসূচি ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে।
অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের কথা বললেন অর্থমন্ত্রী
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে ‘ডেমোক্রেটাইজেশন অব দ্য ইকোনমি’ বা অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ। এর অর্থ হলো দেশের প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের যেসব মানুষ এতদিন অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে ছিল, আমরা তাদের অর্থনীতির মূলধারায় আনতে চাই। সরকারের বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি, যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের সরাসরি সহায়তা, ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ার, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখা।
ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গৃহিণীদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দিলে পরিবার ও সমাজে তাদের ক্ষমতায়ন বাড়বে এবং স্থানীয় বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
রেইস প্রকল্পের প্রশংসা
অনুষ্ঠানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, ‘রেইস প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।’
তিনি জানান, বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিকভাবে নির্বাচিত ১৯টি উদ্ভাবনী প্রকল্পের মধ্যে বাংলাদেশের রেইস প্রকল্পকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পেছনে প্রকল্পটির প্রভাব, উদ্ভাবন, সততা ও টিমওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে অনুষ্ঠানে পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে এবং জিডিপিতেও এ খাতের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি। তাই অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’
তিনি বলেন, ‘রেইস প্রকল্পকে সেই রূপান্তরের একটি কার্যকর বাহন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’
জাকির আহমেদ খান বলেন, ‘পিকেএসএফের বাস্তবায়ন সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি নেভার ফেলিং মনোভাব নিয়ে কাজ করছে। বর্তমানে পিকেএসএফের সঙ্গে ১৬৭টি পার্টনার অর্গানাইজেশন কাজ করছে।’
পিকেএসএফকে আরও কার্যকরী করতে তিনি জানান, রেইস প্রকল্প বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যতিক্রমধর্মী অবদান রাখছে। তবে প্রকল্পকে আরও বিস্তৃত করতে বৈদেশিক সহায়তার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থায়নও বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য তিনি সরকারের পক্ষ থেকে আরো আর্থিক সহায়তা দাবীও করেন।
বক্তব্যের শেষে সরাসরি আর্থিক সহায়তার কথা না বললেও অর্থমন্ত্রী আমীরে খসরু মাহমুদ পিকে এসএফকে সম্ভাব্য সকল সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন।