দেশে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা যখন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, ঠিক তখনই আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মাধ্যমে বজ্রপাতের ঘটনা তিন থেকে চার ঘণ্টা আগেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হলেও সেই সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে কৃষক, জেলে, দিনমজুর ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকছেন।
সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোমেনুল ইসলাম। দেশের দুর্যোগপ্রবণ উপকূল, হাওরাঞ্চল ও কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রম জোরদার করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবিক সহায়তা সংস্থার অর্থায়নে ‘প্রতিষ্ঠা’ নামে একটি প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
মোমেনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পাঁচ দিন পর্যন্ত যে পূর্বাভাস দিয়ে থাকি, তা প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। তবে সময় যত বাড়ে, পূর্বাভাসে ত্রুটির সম্ভাবনাও বাড়ে। বজ্রপাতের ক্ষেত্রে আমরা দুই থেকে চার ঘণ্টা আগেই শনাক্ত করতে পারি কোন ধরনের মেঘ তৈরি হচ্ছে ও কোন এলাকায় বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে। আমরা সতর্কবার্তাও দিই, কিন্তু সেই বার্তা প্রয়োজনীয় পর্যায়ে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে পারি না।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. মো. জামাল উদ্দীন বলেন, ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আগেই ফ্ল্যাশ ফ্লাডের আশঙ্কার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই বন্যার পানি চলে আসে। পরে কিছু অংশের ফসল রক্ষা করা সম্ভব হলেও বড় অংশের ধান রক্ষা করা যায়নি। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৭২০ কোটি টাকা।’
তিনি বলেন, ‘দুর্যোগের প্রভাব শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি প্রাণিসম্পদ ও পশুপালন খাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। আগে এভাবে বজ্রপাতের ঘটনা দেখা না গেলেও বর্তমানে এটি নতুন এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আবহাওয়া অধিদপ্তর বজ্রপাতের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার তিন থেকে চার ঘণ্টা আগেই পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। কিন্তু সেই পূর্বাভাস মাঠপর্যায়ের মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
ড. জামাল উদ্দীন জানান, চলতি বছরে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যেখানে কৃষিকাজ করার সময় বজ্রাঘাতে কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এরপর সেই জমিতে অন্য কৃষকরা কাজ করতেও ভয় পেয়েছেন। তার মতে, আগাম সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া গেলে এ ধরনের পরিস্থিতি ও প্রাণহানি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এসএম রেজাউল করিম বলেন, ‘এই ধরনের আগাম বার্তা শুধু কৃষির জন্য নয়, প্রাণিসম্পদ ও মাছ চাষের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো আমরা এমন কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি, যার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ দ্রুত এই তথ্য পাবে।’
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএফ) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই দেশে বজ্রপাতে ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই কৃষক। অনেক কৃষক অভিযোগ করে জানিয়েছেন, মাঠে কাজ করার সময় তারা কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা পান না। হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হলে নিরাপদ স্থানে যাওয়ারও পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে না। ফলে প্রতিবছরই বহু মানুষ বজ্রপাতের শিকার হচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ বি এম সফিকুল হায়দার। তিনি বলেন, “দুর্যোগ মোকাবিলা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি একটি সমন্বিত ও অংশীদারিত্বভিত্তিক উদ্যোগ। এ ধরনের প্রকল্প ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে এসিএফ-এর ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে আগাম সতর্কতামূলক দুর্যোগ কার্যক্রমকে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
পরে কেয়ার বাংলাদেশের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ফুয়াদ উর রব্বি প্রকল্পের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি জানান, ‘ফরকাস্ট টু অ্যাকশন’ পদ্ধতির মাধ্যমে পূর্বাভাসভিত্তিক তথ্যকে সরাসরি কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করা হবে। এতে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা ও বিভিন্ন খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পটির মাধ্যমে দুর্যোগ-পূর্ব আগাম প্রস্তুতি, সতর্কবার্তা এবং সময়োপযোগী মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। মূলত নদীবিধৌত বন্যাপ্রবণ এলাকা, হাওর অঞ্চল, উপকূলীয় জেলা এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। মৌসুমি বন্যা, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম গ্রহণই হবে এর প্রধান লক্ষ্য।
প্রকল্পটির আওতায় ৮৭ হাজারের বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে লিঙ্গ সমতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সমাপনী বক্তব্যে কেয়ার বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর (প্রোগ্রামস) এমেবেট মেনা বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যাবে প্রতিষ্ঠানটি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, ইকোর (ECHO) প্রোগ্রাম অফিসার মোকিত বিল্লাহসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, মানবিক সংস্থা, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা।