ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাস এই যে, কোনো সাম্রাজ্যই তার পতনের শব্দ আগে থেকে শুনতে পায় না। যখন সামরিক বিস্তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে ছাড়িয়ে যায় এবং অর্থনীতির ভিত ঋণের ভারে নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তখনই পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খালের জাতীয়করণ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য সেই ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’ বা মোড় ঘোরানো মুহূর্ত, যা লন্ডনের বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল।
ব্রিটিশ সূর্য অস্তমিত হওয়ার ঠিক সাত দশক পর ২০২৬ সালের মার্চে এসে আমরা এক অদ্ভুত সমান্তরাল বাস্তবতা দেখছি। হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের যে অনমনীয় অবস্থান এবং তাকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে হাহাকার, তা নিছক কোনো আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সূর্যাস্তের এক স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে। অধ্যাপক জেং বা জেফ্রি সাক্সের মতো দূরদর্শী চিন্তাবিদদের যে আশঙ্কা ছিল, তা আজ ওয়াশিংটনের করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এই অস্থির প্রশাসন সম্ভবত আমেরিকার সেই দম্ভের শেষ অধ্যায়টিই রচনা করে চলেছে।
আজকের আমেরিকার এই দিশেহারা অবস্থার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তার মিত্রদের প্রতি অবজ্ঞা এবং একাকীত্ব। ট্রাম্প যখন যুক্তরাজ্য বা ইউরোপীয় দেশগুলোকে সাহস করে হরমুজ প্রণালি দখল করতে বলেন, তখন তা বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার নেতৃত্বের সংকটকেই নগ্ন করে দেয়। এটি আসলে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়, আমেরিকা নিজে যেখানে যাওয়ার সাহস হারিয়েছে, সেখানে সে তার মিত্রদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। ফ্যাসিবাদী শাসক ট্রাম্প গোটা বিশ্বকে দখলে নিতে চান কোনো রকম আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই। আর এ কাজে তিনি পাশে চান মিত্র ইউরোপকে। তিনি যেন তাদের ডেকে বলছেন, তোমরা কে কোথায় আছো, আসো হরমুজ দখল করি। কিন্তু ইউরোপ এখন অনেক সচেতন। তারা এখন অর্থনীতির হিসাবটাও বোঝেন। অন্যায় অহেতুক যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজানোর ঝুঁকি নিতে চান না তারা। ট্রাম্প যে পাগলামো করছেন, তাতে সায় দিতে নারাজ তারা।
জেনারেল মার্কের ভাষায় এটি ‘খেই হারিয়ে ফেলা পাগলের প্রলাপ’ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইতালির ঘাঁটি দিতে অস্বীকার করা কিংবা জার্মানির প্রেসিডেন্টের কণ্ঠে আমেরিকার ‘অবৈধ যুদ্ধের’ কড়া সমালোচনা প্রমাণ করে যে, গত ৫০ বছরের ইতিহাসে ওয়াশিংটন এতটা নিঃসঙ্গ আর কখনো ছিল না। সামরিক শক্তিতে হয়তো আমেরিকা এখনো শ্রেষ্ঠ, কিন্তু সেই শক্তিকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করার ক্ষমতা সে হারিয়েছে দিনকে দিন। খামখেয়ালির মাত্রা ছাড়ানো ট্রাম্পের শাসনামলে এসে মার্কিন অর্থনীতি এখন নিদারুণ ভগ্নদশায় পড়েছে।
এই সাম্রাজ্যিক পতনের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছে ভঙ্গুর অর্থনীতি। আমেরিকার জাতীয় ঋণ এখন ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম গ্যালন প্রতি ৪ ডলার ছুঁইছুঁই, সাধারণ মার্কিনিদের কাছে ‘আমেরিকান ড্রিম’ এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সিএনএনের তথ্যমতে, গত এক মাসে তেলের দামের এই ৩৪.৭ শতাংশ বৃদ্ধি হারিকেন ক্যাটরিনা বা ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা তাই ঠিকই ধরেছেন, ইরানে কোনো ধরনের পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযান মানেই হবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মহাপ্রলয়, যা ইউরোপকে চিরতরে আমেরিকার বলয় থেকে বের করে দেবে। মার্কিন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন গাড়ির গ্যাসোলিন কিনবে নাকি সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ মেটাবে, সেই উভয়সংকটে পিষ্ট। এই অর্থনৈতিক হাহাকারই জন্ম দিয়েছে ‘নো কিংস’ বা ‘আমাদের কোনো রাজা নেই’ আন্দোলনের।
ওয়াশিংটনের রাজপথে আজ যে বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তা ট্রাম্পের তথাকথিত ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের বিরুদ্ধে এক গণবিস্ফোরণ। ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার ২০০ শহরে লাখো মানুষের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, আমেরিকার ভেতর থেকেই পচন শুরু হয়েছে। জেন ফন্ডার মতো শিল্পীরা যখন স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান, তখন তা কেবল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পরাজয় নয়, বরং মার্কিন গণতন্ত্রের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
মিনেসোটায় ফেডারেল এজেন্টদের হাতে সাধারণ নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা এই ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। হোয়াইট হাউস একে ‘মানসিক উন্মাদনা’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেও, বাস্তব সত্য হলো ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার এখন মাত্র ৩৬ শতাংশে এসে ঠেকেছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং এটি ট্রাম্পের জন্য এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
অন্যদিকে, ইরান আজ আর ১৯৫৬ সালের মিসরের মতো শুধু কূটনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়। তাদের হাতে আছে শক্তিশালী ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অসম যুদ্ধকৌশলের এক বিশাল ভান্ডার। লেবাননে ইসরায়েলি এলিট ফোর্সের ভরাডুবি এবং তেল আবিবে ইরানি মিসাইলের মুহুর্মুহু আঘাত প্রমাণ করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত অপরাজিত শক্তির মিথ ভেঙে গেছে। ইরান আজ একাই লড়ে যাচ্ছে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে, যেখানে পুতিন বা চীনের মতো শক্তিগুলো নেপথ্যে থেকে ছক সাজিয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ২০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত যুদ্ধকালীন বরাদ্দের আবেদন নিয়ে কংগ্রেসে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা আমেরিকার ভেতরের বিভক্তিকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পিট হেগসেথের মতো পেন্টাগন প্রধানরা যখন বাজেট দিয়ে সৈনিক নামের খুনিদের পোষার কথা বলেন, তখন তা খোদ মার্কিন রাজনীতিতেই চরম ঘৃণার উদ্রেক করে।
সাম্রাজ্যগুলো তাসের ঘরের মতো হঠাৎ ভেঙে পড়ে না, বরং তাদের পতনের বীজ বোনা হয় অনেক আগেই। সুয়েজ সংকট যেমন ব্রিটিশদের বিশ্বমঞ্চ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, হরমুজ প্রণালির এই সংঘাত সম্ভবত আমেরিকাকে সেই একই দোজখের ঠিকানায় পৌঁছে দিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠকারী সিদ্ধান্ত, মিত্রদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ জনমতকে উপেক্ষা করার জেদ, এই সবকিছুই ত্বরান্বিত করছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অন্তিম যাত্রা।
ইতিহাস হয়তো একদিন লিখবে যে, আমেরিকা তার দম্ভের শীর্ষচূড়ায় পৌঁছেছিল, কিন্তু এক অহংকারী শাসকের হাত ধরেই তার পতন হয়েছিল। ওয়াশিংটন আজ জয়ের স্বপ্ন দেখছে না, বরং খুঁজছে কোনোভাবে সম্মান বাঁচিয়ে এই গোলকধাঁধা থেকে পালানোর পথ। কিন্তু ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে; ইতিহাসের ঘড়ির কাঁটা আর উল্টো দিকে ঘোরানো সম্ভব নয় বোধ করি।
লেখক: লুৎফর রহমান হিমেল
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]