মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনকে ঘিরে ইরানে জন্ম নিয়েছে এক অভূতপূর্ব সামাজিক আন্দোলন। জানফিদা-এ-ইরান বা ‘ইরানের জন্য আত্মত্যাগ’ নামে পরিচিত এই অনলাইন প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন কোটি কোটি মানুষ। এটি শুধু একটি নিবন্ধন কার্যক্রম নয়; বরং অনেকের কাছে এটি জাতীয় ঐক্য, আত্মপরিচয় ও সমষ্টিগত অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানিদের জান কুরবান করা এই আন্দোলন সম্পর্কে তেহরান থেকে নাগরিক প্রতিদিনের পাঠকদের জন্য লিখেছেন আশরাফুর রহমান।
তেহরানের এক সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে সেই রাতটি ছিল অন্য রাতগুলোর মতোই। শহরের আলো জানালার কাচে প্রতিফলিত হচ্ছিল, দূরে কোথাও ভেসে আসছিল গাড়ির হর্নের শব্দ। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই ২১ বছর বয়সী আরাশ সাদেকি তার ল্যাপটপের সামনে বসে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, যা পরে শুধু তার নয়, লাখো মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠবে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘আমার চারপাশের সবাই এটা করছে। এটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। এটা স্বাভাবিক।’ সেই ‘স্বাভাবিকতা’ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। শুরু হয় একটি অনলাইন প্রচারণা, ‘ইরানের জন্য আত্মত্যাগ’ বা ‘জানফিদা-এ-ইরান’।
নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ করে সাদেকি যখন সাবমিট বাটনে চাপ দেন, তখন থেকেই যেন শুরু হয় এক অদৃশ্য ঢেউ। ফোনে একের পর এক নোটিফিকেশন আসতে থাকে, বন্ধু, সহপাঠী, প্রতিবেশী, সবাই একই পথে হাঁটছে।
আমার সব বন্ধুই এতে আছে, তিনি বলেছিলেন, যেন এটি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ।
এই অনুভূতিই ধীরে ধীরে শহর থেকে শহরে, ঘর থেকে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ অনলাইনে নাম লেখায়, পরিবারে এ নিয়ে আলোচনা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি রূপ নেয় এক চলমান গল্পে।
৩১ মিলিয়নের গল্প: সংখ্যার ভেতরের মানুষগুলো
জানফিদা আন্দোলনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রচারণায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৩১ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গের অঙ্গীকার করে তিন কোটি ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ৫১৫ জন নিবন্ধন করেছেন।
কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে আছে অসংখ্য ব্যক্তিগত গল্প, একজন শিক্ষার্থী, একজন মা, একজন শ্রমিক, একজন বৃদ্ধ শিক্ষক, সবাই।
তেহরানের একটি পরিবারে মা শুধু জানতে চান, ছেলে কাজটি শেষ করেছে কি না। ছেলে মাথা নাড়ে। কোনো বিস্ময় নেই, কোনো প্রশ্নও নয়। যেন এটি জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
অনেকেই বলছেন, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক আন্দোলন নয়; বরং একটি অনুভূতির নাম, একটি সম্মিলিত উপস্থিতি, যা শব্দের চেয়ে বেশি নীরব।
ইরানের বিভিন্ন শহরে রাতের সমাবেশ শুরু হয়। কেউ ব্যানার হাতে, কেউ পতাকা নিয়ে, কেউ আবার নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে এই দৃশ্যগুলো একটি পরিচিত চিত্রে পরিণত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তরুণেরা, বাসা থেকে পরিবারগুলো, কাজ শেষে শ্রমজীবী মানুষ, সবাই যেন এক অদৃশ্য স্রোতে যুক্ত হচ্ছে। কেউ কেউ এই স্রোতকে জনসাধারণের প্রতিরক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, যেখানে মানুষ অস্ত্র নয়, বরং নিজেদের উপস্থিতির মাধ্যমেই অবস্থান জানান দিচ্ছে।
এই প্রচারণার সবচেয়ে দৃশ্যমান দিকগুলোর একটি হলো নারীদের অংশগ্রহণ। তারা শুধু অংশ নিচ্ছেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বও দিচ্ছেন।
কিশোরী জয়নাব যেমনটা বললেন, আমরা এখানে বলতে এসেছি, আমরা ভয় পাই না। তার পাশে থাকা অন্য তরুণীরাও মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানান।
কেউ কেউ শিশু কোলে নিয়ে এসেছেন, যেন পরের প্রজন্মও এই মুহূর্তের সাক্ষী হয়। মাহবুবা ইসলামি বলেন, আমি আমার সন্তানদের এখানে এনেছি, যাতে তারা বুঝতে পারে, এই দেশ শুধু আমাদের নয়, এটি আমাদের দায়িত্বও।
অনেক ইরানি নারী প্রয়োজনে দেশের জন্য অস্ত্র হাতে লড়াই করার কথাও প্রকাশ্যে বলছেন।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যগুলোর একটি দেখা যায় বন্দর আব্বাসের একটি নিবন্ধন কেন্দ্রে। সেখানে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার সংকল্প নিয়ে হাজির হন ১৯৫১ সালের ১২ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা।
নিবন্ধন কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবক তার জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে বিনয়ের সঙ্গে বলেন, ‘মা, আপনার বয়স ৭৫। এই বয়সে কেউ যুদ্ধে যেতে পারেন না।’ কিন্তু বৃদ্ধা একটুও দমে যাননি। অটল কণ্ঠে তিনি জবাব দেন, ‘যোদ্ধাদের তালিকায় আমার নাম থাকলে ইসরায়েল ধ্বংস হয়ে যাবে।’
তার এই তেজস্বী সংলাপ দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইরানি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকের কাছেই তিনি হয়ে উঠেছেন দেশপ্রেম, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও অদম্য প্রতিরোধের জীবন্ত প্রতীক।
রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দেওয়া বার্তাগুলো আন্দোলনটিকে আরও সংগঠিত ও বিস্তৃত করে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় ব্যক্তিরাও এতে যুক্ত হয়েছেন।
সরকারি গণমাধ্যম এই অংশগ্রহণকে ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরছে। সমর্থকদের ভাষ্য, এটি শুধুই একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি বার্তা, জনগণ একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই ঘটনাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। কেউ একে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বলছে, কেউ আবার সামাজিক আন্দোলন হিসেবে দেখছে।
অনলাইন জগতে চলছে আলোচনা, বিতর্ক ও বিশ্লেষণ। কেউ বিস্মিত, কেউ সন্দিহান, আবার কেউ একে ইতিহাসের অংশ হিসেবেও দেখছেন। একজন বিদেশি ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি একটি দেশের মানুষ এভাবে একসাথে অংশ নিতে পারে।’
এই আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ডিজিটাল চরিত্র। কোনো বড় মঞ্চ ছাড়াই এটি ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল স্ক্রিনের মাধ্যমে। একটি লিংক, একটি মেসেজ, একটি শেয়ার, এসবই হয়ে উঠেছে অংশগ্রহণের সেতু। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আধুনিক যুগের এক নতুন ধরনের ভার্চুয়াল জনসমাগম।
অনেক পরিবারে এটি রাতের খাবারের টেবিলের আলোচনায় পরিণত হয়েছে। কেউ উৎসাহ দিয়েছেন, কেউ নীরব থেকেছেন, আবার কেউ শুধু পর্যবেক্ষণ করেছেন। একজন মা বলেন, ‘আমি কিছু বলিনি। কিন্তু তার চোখে আমি বিশ্বাস দেখেছি।’
শহর থেকে গ্রাম, পাহাড় থেকে সমতল, সব জায়গায় একই অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে। একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, ‘আমি জানি না অন্যরা কে, কিন্তু আমরা সবাই একসাথে আছি।’
এই একটি বাক্যই যেন হয়ে উঠেছে পুরো আন্দোলনের অদৃশ্য সেতুবন্ধন। ইরানের ভেতরে অনেকের কাছেই এই প্রচারণা শুধু একটি অনলাইন ফর্ম নয়; এটি একসাথে থাকার, একসাথে দাঁড়ানোর অনুভূতি।
একজন শিক্ষক বলেন, ‘এটি প্রমাণ করেছে আমরা আলাদা নই।’ আরেকজন চিকিৎসকের ভাষায়, ‘এটি শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি সমাজের প্রতিচ্ছবি।’
এই প্রচারণা মানুষের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক আত্মপরিচয় তৈরি করেছে। তেহরানের এক তরুণ শিক্ষক বলেন, ‘আমরা আগে শুধু নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আমরা একই গল্পের অংশ।’
আরাশ সাদেকি আবার ফোন হাতে নেন। নতুন বার্তা আসে, ‘আমি আছি, আমরা একসাথে আছি।’ তিনি ফোন বন্ধ করেন। বাইরে শহর আগের মতোই চলছে। কিন্তু ভেতরে যেন বদলে গেছে সবকিছু, একটি নীরব ঐক্য, যা শব্দের চেয়ে বড়, সংখ্যার চেয়ে গভীর।
এই গল্প শেষ হয়নি। এটি এখনো চলছে, প্রতিটি নাম, প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি নীরব সিদ্ধান্তের সঙ্গে। আর সেই নীরবতার মধ্যেই জন্ম নেয় একটি প্রশ্ন: এটি কি এক নতুন ইতিহাসের সূচনা?
লেখক: ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা (আইআরআইবি)-তে কর্মরত সাংবাদিক