ওমানে চার ভাইয়ের মৃত্যু
ওমানে চার বাংলাদেশি ভাইয়ের মৃত্যুর খবর যেন আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিল, প্রবাস জীবন কেবল ডলার-রিয়াল-রিংগিত আয়ের গল্প নয়, এটি ঝুঁকি, কষ্ট, নিঃসঙ্গতা আর অনেক সময় মৃত্যুর সঙ্গেও লড়াই। রয়্যাল ওমান পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, গাড়ির ভেতরে এসি চালু রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন ওই চার ভাই। গাড়ির ভেতরে জমে থাকা কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়। মৃতরা হলেন রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। কয়েক বছর আগেও হয়তো নিজেদের গ্রামের বাড়ির উঠানে বসে তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন, বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নই থেমে গেল প্রবাসের মাটিতে।
বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রবাস। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট টিনের ঘর থেকে রাজধানীর বহুতল ভবন, অসংখ্য পরিবারের ভরসা একজন প্রবাসী সদস্য। কেউ সৌদি আরবের নির্মাণশ্রমিক, কেউ কাতারের ড্রাইভার, কেউ মালয়েশিয়ার কারখানাকর্মী, কেউ ইতালির রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। তাদের পাঠানো টাকায় চলে সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা, বয়স্ক বাবা-মায়ের চিকিৎসা। শুধু তাই নয়, এই অর্থই আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেড় কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৮০টির বেশি দেশে বাংলাদেশিরা কাজ করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান ছাড়াও মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন।
কিন্তু এই যাত্রা কেবল অর্থ আয়ের নয়, অনেকের জন্য এটি মৃত্যু যাত্রাও হয়ে দাঁড়ায়।
অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরএমএমআরইউর গবেষণা বলছে, শুধু ২০২৪ সালেই বিদেশে প্রায় ৪ হাজার ৮১৩ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় যা আরও বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, মৃতদের গড় বয়স ছিল মাত্র ৩৮ বছর। অর্থাৎ, কর্মক্ষম তরুণ মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছেন বিদেশের মাটিতে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিদেশে মারা গেছেন ৫০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক। অনেকের মরদেহ দেশে ফিরেছে, আবার অনেকেই বিদেশের মাটিতেই দাফন হয়েছেন নীরবে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রায়ই লেখা হয় “স্বাভাবিক মৃত্যু”। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে থাকে অতিরিক্ত পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, তীব্র গরম, মানসিক চাপ, দুর্ঘটনা বা চিকিৎসাহীনতা।
মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমিতে ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয় হাজারো বাংলাদেশিকে। অনেকেই থাকেন গাদাগাদি ছোট কক্ষে। কর্মঘণ্টা বেশি, ছুটি কম, চিকিৎসা সুবিধা সীমিত। তারপরও পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে তারা সবকিছু সহ্য করেন।
কারণ, তাদের পাঠানো অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২৫ সালেও রেমিট্যান্স প্রবাহ নতুন রেকর্ড গড়ার পথে রয়েছে। শুধু ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবাসীরা প্রায় ১৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন।
বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকারও বেশি।
গড়ে প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান প্রবাসীরা। অর্থাৎ প্রতিদিন হাজার কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসছে তাদের হাত ধরে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই অর্থ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়ে যেত। কারণ রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে সাহায্য করে, আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে এবং টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্পের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস রেমিট্যান্স। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব বিশাল। গ্রামের বাজারে নতুন দোকান, বাড়িঘর নির্মাণ, কৃষিজমি কেনা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা, সবকিছুর পেছনে থাকে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত টাকা।
অনেক অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির “নীরব অক্সিজেন” হলো রেমিট্যান্স।
কিন্তু এই অবদানের তুলনায় প্রবাসীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার এখনো অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নের মুখে।
ওমানে চার ভাইয়ের মৃত্যু সেই বাস্তবতাই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। কয়েক বছর আগে কুয়েতে আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন একাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক। মালয়েশিয়ায় নির্মাণসাইটে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বহুবার। সৌদি আরবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কিংবা অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও নিয়মিত।
অনেক সময় মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে আনতেও পরিবারকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ক্ষতিপূরণ পাওয়া তো আরও কঠিন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অধিকাংশ শ্রমিকই কম দক্ষ। ফলে তারা কম বেতনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন। আবার বিদেশ যাওয়ার আগেই অনেককে দালালের কাছে কয়েক লাখ টাকা ঋণ করতে হয়। ফলে বিদেশে গিয়েও তারা দীর্ঘদিন দেনার চাপে থাকেন।
তবুও প্রবাসীরা থেমে থাকেন না।
ঈদের দিনেও তারা পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারেন না। সন্তানের জন্মদিন, বাবার মৃত্যু, মায়ের অসুস্থতা, সবকিছু থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও তারা কাজ করে যান। কারণ তাদের পাঠানো টাকায় হয়তো গ্রামের বাড়িতে নতুন ঘরের চাল উঠছে, ছোট ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, কিংবা মেয়ের বিয়ে হচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতি যখন দুর্বল ছিল, তখনও প্রবাসীরা ছিলেন বড় ভরসা। আজও সেই বাস্তবতা বদলায়নি। বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের চাপ ও আমদানি ব্যয়ের সময় রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, এখন দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। কারণ দক্ষ কর্মীরা বেশি আয় করেন, নিরাপদ পরিবেশে কাজ পান এবং দেশের জন্য আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আনতে পারেন।
ওমানে চার ভাইয়ের মৃত্যু হয়তো কয়েকদিন পর খবরের শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাদের মতো লাখো প্রবাসীর ঘাম, কষ্ট আর ত্যাগ প্রতিদিন নীরবে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে। দেশের রিজার্ভ, বাজার, ব্যবসা, এমনকি অসংখ্য পরিবারের মুখে হাসির পেছনেও আছে তাদের অদৃশ্য শ্রম।
তাই প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স যোদ্ধা নন, তারা আসলে দেশের নীরব অর্থনৈতিক সৈনিক।