ইরান যুদ্ধে প্রতিমূহুর্তে হামলায় ব্যবহার হচ্ছে ক্ষেপনাস্ত্র। যুদ্ধের বড় এক হাতিয়ার আধুনিক এই সমরাস্ত্র। আকাশে ছোঁড়া একটি ধাতব দণ্ড কিভাবে হাজার কিলোমিটার দূরের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু খুঁজে নেয়?
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, একটি বোতাম চাপলেই রকেটটি ছুটে গিয়ে লক্ষ্যে আঘাত করে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়ার পেছনে কাজ করে পদার্থবিদ্যা, গণিত ও উচ্চতর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অবিশ্বাস্য সমন্বয়। একটি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যপদ্ধতিকে মূলত চারটি প্রধান ধাপে ভাগ করা যায়।
উৎক্ষেপণ: ক্ষেপণাস্ত্রের মূল চালিকাশক্তি হলো এর প্রপালশন সিস্টেম। সাধারণত রকেট ইঞ্জিনের জ্বালানি পুড়ে প্রচণ্ড গতিতে গ্যাস নির্গত হয় ও নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী ক্ষেপণাস্ত্রটি সামনের দিকে ধাবিত হয়। আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে মূলত দুই ধরনের জ্বালানি ব্যবহৃত হয়।
সলিড ফুয়েল: এটি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং খুব দ্রুত উৎক্ষেপণ করা সম্ভব (যেমন আন্তঃমহাদেশীয় বা অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল)।
লিকুইড ফুয়েল: এটি ইঞ্জিনের শক্তি নিয়ন্ত্রণ বা মাঝপথে ইঞ্জিন বন্ধ ও পুনরায় চালু করতে সুবিধা দেয়।
পথপ্রদর্শন বা গাইডেন্স: এটি ক্ষেপণাস্ত্রের মস্তিষ্ক। আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোটেও অন্ধভাবে ওড়ে না। এর ভেতরে থাকে ইনর্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম, জাইরোস্কোপ এবং অ্যাক্সিলেরোমিটার। বর্তমান সময়ে এর সাথে যুক্ত হয়েছে জিপিএস বা স্যাটেলাইট নেভিগেশন। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ওড়ার সময় প্রতি মুহূর্তে নিজের অবস্থান হিসাব করে এবং ভুল পথ সংশোধন করে নেয়। লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছালে এর নিজস্ব অ্যাক্টিভ রাডার, ইনফ্রারেড সেন্সর (তাপ শনাক্তকারী) বা লেজার সিকার সক্রিয় হয়ে লক্ষ্যবস্তুকে লক করে ফেলে।
ফ্লাইট কন্ট্রোল: ক্ষেপণাস্ত্রের শরীর বা গায়ে ছোট ছোট পাখা বা ফিন থাকে। ভেতরের কম্পিউটার যখন বুঝতে পারে সে পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে, তখন এই ফিনগুলো নড়াচড়া করে বাতাসের বাধা ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রের দিক পরিবর্তন করে। ডানে-বায়ে ঘোরা বা উচ্চতা বাড়ানো-কমানোর এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাতাসের গতি, মাধ্যাকর্ষণ, এমনকি পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রভাবও নিখুঁতভাবে গণনা করা হয়।
লক্ষ্যভেদে আঘাত: সবশেষে আসে ধ্বংসের পালা। এর ভেতরে থাকা ফিউজ সিস্টেম সিদ্ধান্ত নেয় কখন বিস্ফোরণ ঘটবে। এটা সরাসরি আছড়ে পড়লে বিস্ফোরিত হতে পারে। এ ছাড়া লক্ষ্যবস্তুর নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌঁছালে এটি বাতাসে বিস্ফোরিত হতে পারে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়।
ক্ষেপণাস্ত্রের ভিন্নতা
প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন আলাদা হয়:
ব্যালিস্টিক মিসাইল: এটি ধনুকের মতো বাঁকা পথে মহাকাশের কিনারা ছুঁয়ে আবার বায়ুমণ্ডলে নেমে আসে।
ক্রুজ মিসাইল: এটি মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায় যাতে শত্রুর রাডারকে ফাঁকি দেওয়া যায়।
অ্যান্টি-এয়ার মিসাইল: এটি চলন্ত যুদ্ধবিমানকে ধাওয়া করে ধ্বংস করতে সক্ষম।
সহজ কথায়, একটি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র হলো একটি উড়ন্ত কম্পিউটার। একটি বোতাম চাপার পেছনে থাকে প্রযুক্তির চূড়ান্ত উৎকর্ষতা, যার একমাত্র লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিখুঁতভাবে পৌঁছানো। এটি কেবল একটি সাধারণ বিস্ফোরণ নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর ও ভয়ংকর প্রয়োগ।