রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির ১১ নম্বর সড়কের ৩১ নম্বর বাড়ি। ওই ভবনেরই ১৩ তলা ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছেন আল মোকাব্বর অর্ণব ইসলাম নামের এক যুবক। পত্রপত্রিকাতেও এভাবেই সংবাদটি এসেছে। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, শতকোটি টাকার লোভে নিজের ভাতিজাকে খুন করেছেন পুলিশের বরখাস্ত হওয়া এক উপপরিদর্শক (এসআই)। ওই এসআইয়ের নাম ওসমান গনি। ওসমান আলোচিত এক হত্যা মামলার আসামীও ছিলেন। যার কারণে পুলিশ বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হন তিনি।
গত ২ মে আল মোকাব্বর অর্ণব ইসলামের দেহ পাওয়া যায় তাদেরই বাসার সামনে। আপাতদৃষ্টিতে দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা মনে হলেও, এখন বেরিয়ে আসছে রোমহর্ষক তথ্য। শত কোটি টাকার উত্তরাধিকারের জন্যই হয়তো প্রাণ হারালেন ৩২ বছর বয়সী এই যুবক। তার মোবাইল কল লিস্টেও এমনই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অর্ণব ছিলেন পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক এডিজি রফিকুল ইসলামের একমাত্র পুত্র। গ্রিন হেরাল্ড স্কুল থেকে ও এবং এ- লেভেল সম্পন্ন করা মেধাবী এই তরুণ গেলো ৮-৯ বছর ধরে বাবার বিশাল সম্পত্তি ও ব্যবসা দেখাশোনা করছিলেন। কিন্তু সেই সম্পত্তিই যে তার জীবনের জন্য কাল হয়ে আসবে, তা হয়তো কল্পনাতেও ছিল না অর্ণবের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবারের সদস্যরা অভিযোগের আঙুল তুলেছেন অর্ণবের চাচা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ওসমান গনির দিকে। ওসমান গনির বিরুদ্ধে ১৯৯৯ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুবেল হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। ওসমান তখন এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই ঘটনায় পরবর্তীতে তিনি চাকরিচ্যুতও হন।
২০১৭ সালে বড় ভাই রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর পর এই ওসমান গনিই পরিবারের কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ দেখাশোনার অলিখিত দায়িত্ব পান। পরিবারের দাবি, ভাতিজাকে সরিয়ে দিয়ে পুরো সম্পদের একক নিয়ন্ত্রণ নিতেই এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন ওসমান গনি।
সাবেক এডিজি রফিকুল ইসলামের রেখে যাওয়া সম্পদের একটি খতিয়ান এসেছে নাগরিক প্রতিদিনের হাতে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ধানমন্ডির ৮ নম্বর রোডের ৭০ নম্বর প্লটের বহুতল আবাসিক ভবন 'ইস্টার্ন মোবারক', মগবাজারে একাধিক বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট এবং রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে একাধিক বাণিজ্যিক দোকান রয়েছে রফিকুল ইসলামের। এছাড়াও নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে অন্তত ১০০ একর কৃষি জমি এবং ১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ‘উমেদ আলী ভূঞা উচ্চ বিদ্যালয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, অর্ণব জীবিত থাকাকালে এই বিশাল সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন চাচা ওসমান গনি। কিন্তু একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে অর্ণব সেই জমি বিক্রির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের কিছু জমি নিয়ে চাচার সাথে অর্ণবের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে অর্ণবের মোবাইলে একটি কল আসে। ফোনের অপর প্রান্তে ছিলেন কিশোরগঞ্জের এক প্রভাবশালী জমি ব্যবসায়ী। সেই ব্যবসায়ীর সঙ্গে রফিকুল ইসলামের পরিবারের কিছু জমি কেনাবেচা নিয়ে আলোচনা চলছিল। বিস্ময়কর তথ্য হলো, ঘটনার সময় ওই জমি ব্যবসায়ীর মোবাইলের লোকেশন ধানমন্ডি এলাকাতেই পাওয়া গেছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, অর্ণব যখন জমি বিক্রির ‘গোপন চুক্তির’ বিরোধিতা করছিলেন, তখনই তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়। সেই ব্যবসায়ী এবং চাচা ওসমান গনির মধ্যে কোনো গোপন আঁতাত ছিল কি না, তা এখন তদন্তের মূল বিষয়।
অর্ণবের পারিবারিক জীবনও ছিল বৈচিত্র্যময় ও কিছুটা বিষাদগ্রস্ত। তার মা হালিমা খাতুন সোনালী ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ২০ বছর আগে রফিকুল ইসলামের সাথে তার বিচ্ছেদ হয় এবং তিনি ধানমন্ডিতে আলাদা ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। অর্ণবের বড় বোন লন্ডনে স্থায়ী এবং ছোট বোন সাউদা ইসলাম পূর্ণা ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। বাবার মৃত্যুর পর অর্ণব কার্যত একাই বিশাল এই সাম্রাজ্যের হাল ধরেছিলেন, যা তাকে লোভী স্বজনদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত করেছিল।
অর্ণবের মৃত্যুর পর তার পরিবার এখন সম্পত্তি রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। কিশোরগঞ্জ জেলা জজ আদালতে সম্পত্তির ওপর ‘স্থিতাবস্থা’ জারির আবেদন করা হয়েছে, যাতে অর্ণবের অনুপস্থিতিতে কোনো পক্ষ জমি বিক্রি বা নামজারি করতে না পারে। পরিবারের দাবি, সম্পত্তির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা বিশ্বস্ত কর্মচারীদেরও বর্তমানে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ধানমন্ডি থানা পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটিকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে অর্ণবকে কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য বা বিষ প্রয়োগ করে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল কি না। এছাড়াও সন্দেহভাজন চাচা ওসমান গনি এবং সেই প্রভাবশালী জমি ব্যবসায়ীকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ওসমান গনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন এবং বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
সিআইডির সাইবার টিম অর্ণবের ই-মেইল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো পরীক্ষা করছে, যেখানে কোনো ব্ল্যাকমেইল বা হুমকির তথ্য আছ কিনা তা যাচাই-বাছাই চলছে। পাওয়া যেতে পারে।