বিটিএল গ্রুপের মির্জা বাশারের প্রতারণা!
একটি কিংবা দুটি নয়, অভিযোগের পাহাড় জমেছে বিটিএল গ্রুপের শীর্ষ কর্তা মির্জা আবুল বাশারের বিরুদ্ধে। কেউ বলছেন- বিদেশে পাঠানোর নামে জীবনের সব সঞ্চয় লুটে নেওয়া হয়েছে, কেউ বলছেন- কাজ করেও পারিশ্রমিক পাননি। আবার কেউ অভিযোগ করছেন- ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়ার।
মির্জা বাশারের প্রতারণার চিত্র পাওয়া যায় নাটোরের বাসিন্দা মাসুদের অভিযোগে। তার দাবি, কয়েক বছর আগে ভালো কাজের আশ্বাসে বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন বাশার। এসময় প্রায় ৮ লাখ টাকা বাশারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মাসুদ। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে তাকে বিদেশে পাঠানো তো দূরের কথা, পরবর্তীতে দিনের পর দিন ঘুরেও সেই অর্থ ফেরত পাননি মাসুদ। বাধ্য হয়ে এই ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয় নিলে, জেল খাটে বাশার।
বাশারের প্রতারণার হাত থেকে রেহাই পাননি খেটে খাওয়া সাধারণ উদ্যোক্তারাও। আব্দুল্লাহ নামের ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজের বকেয়া অর্থ না পাওয়ার অভিযোগ এনেছেন। তাঁর দাবি, মির্জা বাশারের একটি অফিসের ভেতরের ডেকোরেশন ও ইন্টেরিয়রের কাজ শেষ করার পর প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। কাজ বুঝে নেওয়ার পর বাশার আজ-কাল বলে বছরের পর বছর ধরে আব্দুল্লাহকে ঘোরাচ্ছেন কিন্তু টাকা দিচ্ছেন না।
শুধু আব্দুল্লাহ নন, পণ্য বা সেবা সরবরাহকারী বহু ব্যবসায়ীও বাশারের কাছে এসে একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। পণ্য বা সেবা নেওয়ার পর অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রতারণা করা বাশারের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মির্জা আবুল বাশারের এই বিশাল সাম্রাজ্যের প্রভাব বিস্তারের নেপথ্যে রয়েছেন তাঁর কথিত স্ত্রী এবং ঢালিউডের অভিনেত্রী ববি। তিনি ‘বিটিএল গ্রুপ’-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে পরিচিত। অভিযোগকারীদের দাবি, বাশার বিভিন্ন জায়গায় মানুষকে আশ্বস্ত করতে এবং নিজের প্রভাব জাহির করতে সুকৌশলে অভিনেত্রী ববির নাম ও পরিচিতি ব্যবহার করতেন। এ ব্যাপারে অভিনেত্রী ববির মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দেননি।
বাশারের এই ক্ষমতার দাপট সম্প্রতি রূপালী পর্দাতেও আঘাত হেনেছে। মুক্তিপ্রাপ্ত ‘তছনছ’ চলচ্চিত্রকে ঘিরে এক নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সিনেমাটির একটি সংবাদ সম্মেলনে অভিনেত্রী ববি না আসাকে কেন্দ্র করে অভিনেতা মুন্না খানের সঙ্গে বাশারের তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, অভিনেতা মুন্না খানকে সরাসরি ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিলেন মির্জা আবুল বাশার।
বিটিএল গ্রুপের নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে সামনে আসে আরেকটি রহস্যময় চরিত্র—আলী আব্বাস। কোম্পানির বিভিন্ন অফিশিয়াল নথি, ব্যাংকিং লেনদেন ও পরিচয়ে তাকে বিটিএল গ্রুপের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সুর বদলে এক অদ্ভুত সাফাই গাইলেন আলী আব্বাস—নথিতে যিনি কোম্পানির সদস্য, তিনি ২৫ হাজার টাকার সাধারণ চাকরিজীবী! তবে প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ না হলে বিটিএল গ্রুপের প্রতিটি অবৈধ লেনদেন ও বিতর্কিত নথিতে কেন বারবার আলী আব্বাসের স্বাক্ষর ও সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে? এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
এসব বিষয় নিয়ে মির্জা আবুল বাশারের মন্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি।
বিদেশে পাঠানোর ভুয়া প্রতিশ্রুতি, বকেয়া বিলের টাকা আত্মসাৎ, ভাড়ার গাড়ি ও গরু ক্রয়ের নামে জালিয়াতি থেকে শুরু করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে হুমকি-ধমকি; সব মিলিয়ে মির্জা আবুল বাশার ও তাঁর বিটিএল গ্রুপকে ঘিরে অসংখ্য অপরাধের তথ্য পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ এখন এই প্রতারকের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।