মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে যানবাহন চালকদের। কোথাও লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে বাগবিতণ্ডা, আবার কোথাও নির্ধারিত পরিমাণের বেশি জ্বালানি না পেয়ে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত জ্বালানি সংকট নেই বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও মানুষের উদ্বেগ কমেনি। বরং সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় অনেকে আগেভাগেই জ্বালানি মজুত করতে চাইছেন, ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় বাড়ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ঝুঁকিও বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিবিসি বাংলাকে বলেন, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তার ভাষায়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের মধ্যে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুতই কেটে যাবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, পেট্রোল ও অকটেন দেশে উৎপাদিত হওয়ায় তা নিয়ে বড় সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকায় বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে।
এরই মধ্যে ভারত থেকে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া বিপিসি ও ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত নুমালিগড় রিফাইনারির মধ্যে আগের চুক্তির আওতায় পাঁচ হাজার টন ডিজেল ইতোমধ্যে দেশে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীনের সঙ্গেও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ওই পথ দিয়ে বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৫টি জ্বালানিবাহী জাহাজ আসে। যুদ্ধ শুরুর পর চলতি মাসে এখন পর্যন্ত ছয়টি জাহাজ পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে বিপিসির এক কর্মকর্তা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়েছে। গত ৫ মার্চ ১১ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়, যেখানে গাড়ির ব্যবহার সীমিত রাখা, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা এড়িয়ে চলা ও যানবাহনভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন স্থানে বাগবিতণ্ডা ও মারপিটও হয়েছে। অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন মালিকরা।
এদিকে বৈশ্বিক বাজারেও অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে গেলেও পরে কিছুটা কমে আসে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৮৮ ডলারের কাছাকাছি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির ওপরই মূলত নির্ভর করছে জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংকটের সময়ে সরকারের কঠোর কিছু পদক্ষেপ নেওয়া স্বাভাবিক এবং এখন পর্যন্ত বড় ধরনের অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত দেখা যায়নি।