দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন থেকে টর্পেডো হামলার শিকার হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ ভারতের পূর্ব উপকূলে ৭০টির বেশি দেশের ৪১টি জাহাজের সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ মহড়ায় যোগ দিয়েছিল।
সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতা এবং সামুদ্রিক আইনের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করতেই এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
বুধবার (৪ মার্চ) জাহাজটিতে হামলা এবং এতে থাকা কমপক্ষে ৮৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা এখন ভারতের জন্য একটি রাজনৈতিক জটিলতায় পরিণত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেনাকে ‘ভারতীয় নৌবাহিনীর অতিথি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং লিখেছেন, আমেরিকান সাবমেরিনটি এর ক্রু সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘নৃশংসতা’ চালিয়েছে।
প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ডেনা ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি।
ভারতীয় নৌবাহিনী জানিয়েছে, তারা বুধবার সকালে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর কাছ থেকে ইরানি যুদ্ধজাহাজটি সম্পর্কে একটি জরুরি সংকেত পেয়েছিল এবং উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছিল।
হামলার পরদিন মোদি কেবল এটুকুই বলেছেন, ভারত ‘বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য প্রতিটি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা অব্যাহত রাখবে।’
বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে ভারতের ‘কৌশলগত এবং জাতীয় স্বার্থের বেপরোয়া অবহেলার’ অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি বলেন, মোদি দেশের মেহমানদের পক্ষে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ভারত এখন ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মাঝে পড়ে এক অস্বস্তিকর অবস্থানে রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত এই প্রতিটি পক্ষেরই বন্ধুপ্রতিম অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে নতুন এই যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে ভারত সরকার কোনো পক্ষের প্রতিই ক্ষোভ বা সহমর্মিতা প্রকাশ করেনি।
তবে সাধারণ ভারতীয়রা এরই মধ্যে টর্পেডো দিয়ে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
বন্দর সংলগ্ন কৈলাসগিরির একটি পার্ক দেখাশোনা করেন এস ভেঙ্কটেশ, যেখানে আন্তর্জাতিক নৌবহরটি নোঙর করেছিল।
ডেনার ক্রুসহ অন্যান্য নাবিকদের সেখানে স্বাগত জানানো হয়েছিল এবং তারা পার্কে হিন্দু দেবতা শিব ও পার্বতীর বিশাল সাদা মূর্তিগুলো ঘুরে দেখেছিলেন।
ভেঙ্কটেশ বলেন, ‘এটি সত্যিই হৃদয়বিদারক। মাত্র কয়েক দিন আগে আমি ইরানের এই তরুণদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলাম। তাদের নাস্তা পরিবেশন করা হয়েছিল। তারা ছবিও তুলেছিলেন।’
ভারতের অবসরপ্রাপ্ত ভাইস অ্যাডমিরাল অরুণ কুমার সিং গত ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি কুচকাওয়াজে অতিথি হিসেবে ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ইরানি জাহাজগুলো এবং তাদের নৌসেনাদের ব্যান্ডের তালে মার্চ করতে দেখেছিলাম। আমার মনে হয়, তাদের অর্ধেকের বেশি এখন মৃত।’
তবে ডেনা ও তার ক্রু সদস্যদের ভাগ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতকে দোষারোপ করেননি অরুণ কুমার সিং।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। যেকোনো যুদ্ধরত পক্ষকে আন্তর্জাতিক জলসীমার যেকোনো জায়গায় আক্রমণ করা যেতে পারে।’
ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ এই হামলার সমালোচনা করলেও স্বীকার করেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় পড়তে পারে।
প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক রাজদীপ সারদেসাই বলেন, ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনেরও’ কিছু নৈতিক ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।
'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' হলো ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতি, যা স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই দেশটিকে নিরপেক্ষ রেখেছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক কূটনীতিক তালমিজ আহমদ বলেন, ‘আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম, ভারতের উচিত এই অঞ্চলে ইরান ও আরব দেশগুলোর মধ্যে একজন শান্তিস্থাপক হিসেবে ভূমিকা পালন করা।’
বহু বছর ধরে ভারত ইরানের ভালো বন্ধু। তাদের কাছ থেকে তেল কেনা এবং আরব সাগরে ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করেছে ভারত।
তালমিজ আহমদ বলেন, একই সময়ে ‘উপসাগরীয় অঞ্চল ছিল ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু’। যদিও ইরান ও তার আরব প্রতিবেশীদের মধ্যে শত্রুতা ছিল। মোদি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১১ বছরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে উষ্ণ হয়।
বিগত দশকগুলোতে ভারত ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল—উভয় পক্ষের সঙ্গেই দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছিল।
কিন্তু গত ২০ বছরে চীনকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ভারতের যে নীরব ঝোঁক তৈরি হয়েছে, তার অংশ হিসেবে ভারত ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি এসেছে। ইসরায়েল বর্তমানে ভারতের সামরিক সরঞ্জাম এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের একটি বড় উৎস।
গত ২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণার পর ভারত তিনটি ইরানি পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার আটক করে, যেগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন কর্তৃপক্ষ তেল পাচারের অভিযোগ তুলেছিল।
এর কয়েক দিন পর ভারত সরকার পার্লামেন্টে জানায়, ইরানি বন্দর প্রকল্পে তাদের প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন হয়েছে।
মোদি গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলে যান এবং দুই দেশের সম্পর্ককে ‘বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করে ভারতের অবস্থান আরও পরিষ্কার করেন।
তা সত্ত্বেও, মোদি ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থনে জনসম্মুখে কোনো বিবৃতি দেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শুল্ক আরোপের মতো বৈরিতা এবং গত বছর ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তিস্থাপকের ভূমিকা নিয়ে সৃষ্ট প্রকাশ্য বিভেদের পর মোদি সম্ভবত নিজের কৌশলী অবস্থানের জন্য কিছুটা জায়গা ধরে রাখতে চাইছেন।