পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে রাজ্যটির লাখ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে সমালোচকেরা ‘রক্তপাতহীন রাজনৈতিক গণহত্যা’ এবং ‘সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার গণপ্রচেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে মোট ৯১ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের ১০ শতাংশেরও বেশি। যদিও এর মধ্যে অনেকের মৃত্যু বা দ্বৈত নিবন্ধনের মতো কারণ রয়েছে। তবে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ তাদের নাম বাতিলের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানালেও শেষ পর্যন্ত তাদের তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নামে পরিচিত, যা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার এই প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে ‘অনুপ্রবেশকারী’ (মূলত অবৈধ মুসলমান বাংলাদেশি অভিবাসীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়) ঠেকানোর কথা বলেছে।
এই বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভোটার তালিকা ‘শুদ্ধিকরণ’ হিসেবে অভিহিত করলেও এটি ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে নজিরবিহীন দ্রুতগতিতে এই নতুন ভোটার তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি আশা করছে, ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের হাত থেকে বাংলার শাসনভার এবার কেড়ে নেবে তারা।
তৃণমূলের সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “বাংলায় যা ঘটেছে, তা সাংবিধানিক অপরাধ। এটি ভারতের মানুষের বিরুদ্ধে, বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ। স্বাধীনোত্তর ভারতের ইতিহাসে এটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট' ভারতের সংবিধান প্রদত্ত মহান অধিকার। আপনি যতই দরিদ্র বা অসহায় হন না কেন, আপনার ভোটের অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”
বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন সংস্থার মতে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাম আনুপাতিক হারের চেয়ে অনেক বেশি বাদ দেওয়া হয়েছে, যা সুপরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং নিপীড়নের অভিযোগকে জোরালো করছে।
সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সাবর ইনস্টিটিউটের প্রধান সাবির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের গবেষণা অনুযায়ী, ধর্মই এখানে সবচেয়ে বড় বিভেদকারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলমানরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
বিজেপি ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সফল হলেও পশ্চিমবঙ্গে এখনো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ, রাজ্যটির বিশালসংখ্যক মুসলমান জনগোষ্ঠীর সমর্থন তাদের নেই; যারা বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা নিয়ে শঙ্কিত।
কিছু মুসলমান অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকায় প্রায় অর্ধেক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যাদের কাছে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ রয়েছে এবং তারা নিজে বা তাদের মা-বাবা ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিলেন, যা ভোটার হওয়ার যোগ্যতার চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে ধরা হয়।
‘যাদের নাম বাদ পড়েছে, তারা সবাই মুসলমান’
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মুর্শিদাবাদ জেলার শেরপুর গ্রামে ৩৬ বছর বয়সী জাবের আলী ছিলেন ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য নথিপত্র সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা অন্যতম কর্মকর্তা।
টানা চার মাস ধরে জাবের ৭০০-র বেশি বাড়িতে গিয়েছেন, নথিপত্র যাচাই করেছেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত তথ্য আপলোড করেছেন।
তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমি ১২ ঘণ্টা মাঠে কাজ করতাম। তারপর রাতের অধিকাংশ সময় কম্পিউটারে কাজ করতাম। খুব কমই ঘুমানোর সুযোগ পেতাম।’
কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষে যখন সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশ হলো, জাবের দেখলেন, তিনি যাদের তথ্য যাচাই করেছিলেন, তাদের অধিকাংশেরই নাম নেই। এমনকি তার নিজের নামও বাদ পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ আমাকে ফোন করে বলতে লাগল, আমি আমার কাজ ঠিকমতো করিনি। অথচ পরিহাসের বিষয় হলো, আমার নিজের এবং আমার ভাইদের নামও তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
জাবের আলী জানান, শেরপুর গ্রামে এখন এক ধরনের ‘আতঙ্ক’ বিরাজ করছে। আজীবন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে বাস করা মানুষগুলো এখন ‘বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার এবং দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
তার মতে, ‘এই গণহারে বাদ দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট ধরন রয়েছে। যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই মুসলমান। মানুষ মনে করছে, তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে এবং ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’
সমালোচকেরা আইনিভাবে এই এসআইআর প্রক্রিয়াকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং এটিকে ‘বিজেপির সুবিধার্থে নির্বাচনী ব্যবস্থায় কারচুপির চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের নির্বাচন কমিশন যা এই প্রক্রিয়ার তদারকি করছে, তাকে আর ‘নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সংস্থা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরাইশি পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য রাজ্যে এসআইআর-এর প্রক্রিয়া ও যৌক্তিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমার উত্তরসূরি সম্পর্কে মন্তব্য করা আমার জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে যা ঘটছে, তা দেখে আমাকে কথা বলতেই হবে। এই এসআইআর সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং এটি মানুষকে হয়রানি করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে এটি একটি বিপর্যয় এবং এর উদ্দেশ্য মহৎ নয়। ভোটার তালিকায় ৯৯ শতাংশ নির্ভুলতা অর্জনে আমাদের ৩০ বছর সময় লেগেছিল। আর তারা আশা করছে, তিন মাসে তার চেয়েও বেশি নিখুঁত কাজ করবে! যদি নির্ভুলতাই প্রধান লক্ষ্য হয়, তাহলে এত তাড়াহুড়ো কেন?’
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তথ্যের যৌক্তিক অসঙ্গতি খুঁজে বের করতে একটি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত (এআই) অ্যালগরিদম ব্যবহারের সিদ্ধান্তের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কুরাইশি।
এই অ্যালগরিদমের কারণে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনসহ লাখ লাখ বাঙালিকে তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হয়েছে এবং অনেকে ওই ২৭ লাখ বাদ পড়া ভোটারের তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অ্যালগরিদম কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে ব্যর্থ। যেমন, বাংলা নাম ইংরেজিতে লেখার কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই এবং বংশানুক্রমে অনেক বাঙালি পদবীর বানানে সামান্য পরিবর্তন এসেছে, যা পারিবারিক নথিপত্রে ছোটখাটো অসঙ্গতি তৈরি করে।
এছাড়া এটি ১৬ বছরের কম বয়সী বাবা-মা কিংবা পাঁচের বেশি ভাইবোন থাকাকে ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যদিও আগের প্রজন্মের মানুষের কাছে এটি ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা।