২০২৬ সালের ৪ মে তারিখটি ভারতের সমকালীন রাজনীতির ইতিহাসে একটি আলোচিত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই দিনটি কেবল পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিন ছিল না, বরং এটি ছিল দুই প্রবল প্রতাপশালী আঞ্চলিক নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এম কে স্ট্যালিনের রাজনৈতিক অপরাজেয়তার মিথ ভেঙে যাওয়ার দিন।
রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের অজেয় এই দুই নেতা তাদের নিজেদের আস্তানাতেই পরাজিত হয়েছেন এবং তাদের দলগুলো বর্তমানে দ্বিতীয় সারিতে নেমে এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৫ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির পেশিবহুল এবং উগ্র জাতীয়তাবাদকে প্রতিহত করে আসছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই প্রতিরোধ সম্পূর্ণ ভেঙে খানখান হয়ে পড়ে।
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র ৩টি আসনে জয়লাভ করেছিল, যা ২০২৬ সালে এসে ২০৬টি আসনে উন্নীত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ উঠছে। তারপরও বিজেপির এই উত্থান অভাবনীয়। মমতার দলের বেশুমার দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনাচারও যে পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে, তা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল তার ক্ষমতা হারাননি, বরং নিজের দীর্ঘদিনের দুর্গ ভবানীপুর কেন্দ্রে একসময়ের বিশ্বস্ত সহযোগী ও বর্তমান কট্টর প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারীর কাছেই পরাজিত হয়েছেন।
পরাজয়ের পরপরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই জয়কে অনৈতিক বলে আখ্যা দেন এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে দাবি করেন যে, বিজেপি প্রায় ১০০-র বেশি আসন ‘লুট’ করে নিয়েছে।
প্রশাসনিক ক্ষমতা ও মুখ্যমন্ত্রীত্বের গদি ছাড়া বিজেপির মোকাবিলা করা এখন মমতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি পুনরায় ‘বাংলার মানুষ বনাম বহিরাগত’ তত্ত্ব সামনে এনে নিজেকে রাজ্যের ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এম কে স্ট্যালিনের পরাজয় মমতার চেয়েও বেশি আকস্মিক, কারণ সেখানে পতনের কোনো স্পষ্ট নিম্নমুখী প্রবণতা আগে পরিলক্ষিত হয়নি। সুপারস্টার বিজয়ের নবগঠিত দল ‘তামিলাগা ভেট্টি কাঝাগম’ (টিভিকে) প্রথমবার নির্বাচনে নেমেই ১০৮টি আসন জিতে এক অভাবনীয় নজির সৃষ্টি করেছে, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার (১১৮ আসন) চেয়ে মাত্র ১০টি কম।
ম্যান অফ স্টিল খ্যাত এম কে স্ট্যালিন তার নিজের কেন্দ্র কোলাথুরে পরাজিত হয়েছেন ভিএস বাবুর কাছে, যিনি একসময় স্ট্যালিনের জয়ের মূল কারিগর ছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে অবহেলিত হয়েছিলেন। এখানেও ঠিক মমতার মতোই দৃশ্যপট হাজির হয়েছে। নিজ সহকারীর কাছেই নাস্তানাবুদ নেতা।
স্ট্যালিন এই পরাজয়কে ইতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করছেন এবং একে ডিএমকে-র ‘এক নতুন পর্যায়ের শুরু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মমতার মতো তিনি বড়সড় কোনো অভিযোগ তোলেননি।
বিজয়ের বিজয়ে তামিলনাড়ুর প্রথাগত ডিএমকে-এআইএডিএমকে দ্বিমেরু শাসনের অবসান ঘটিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটি দ্রাবিড় আদর্শের অবসান নয়। বিজয় নিজেও ইভি ‘পেরিয়ার’ রামাসামি এবং এমজিআর-এর আদর্শকে সামনে রেখেই তার রাজনৈতিক ভিত গড়েছেন। এই দ্বৈত পরাজয় ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যস্থান ও নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতনের ফলে ঝাড়খণ্ড ব্যতীত ভারতের সমগ্র পূর্ব প্রান্তে বিজেপির প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিহার থেকে ওড়িশা পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক করিডোর তৈরি করে দিলো।
পূর্ব ভারতে সফল হলেও দক্ষিণ ভারত এখনো বিজেপির জন্য একটি জটিল ধাঁধা হয়েই আছে, কারণ কেরালা ও তামিলনাড়ুতে তারা সরাসরি জয়ের মুখ দেখেনি। তবে এআইএডিএমকে-র মতো মিত্রদের শক্ত অবস্থান তাদের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে।
৭১ বছর বয়সী মমতা এবং ৭৩ বছর বয়সী স্ট্যালিনের জন্য এই হার কেবল ক্ষমতাচ্যুতি নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের গোধূলি বেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারতের স্থানীয় পত্রিকা এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিজেপি ক্ষমতায় আসায় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের নীতির সংঘাত দূর হতে পারে, যা দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা পানি চুক্তির জট খুলতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তৃণমূলের শাসনামলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় একটি স্থিতাবস্থা ছিল। বিজেপির ভিন্ন সীমান্ত নীতি ও এনআরসি ইস্যু বাংলাদেশের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ২০২৬ সালের ভোটের এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, ভোটাররা কেবল প্রথাগত স্লোগান বা ব্যক্তিপূজায় সন্তুষ্ট নন।