মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দেওয়ার পর এবার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো আগ্রাসনকে স্মরণীয় এবং সমুচিত জবাব দিতে প্রস্তুত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় গালিবাফ বলেন, ভুল কৌশল ও ভুল সিদ্ধান্ত সবসময় ভুল ফল বয়ে আনে। তার দাবি, পুরো বিশ্ব এখন তা বুঝতে শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, ইরান সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত এবং প্রতিপক্ষ তেহরানের কাছ থেকে এমন সমুচিত জবাব পাবে যা তারা কল্পনাও করতে পারবে না।
এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের দেওয়া নতুন প্রস্তাবকে দুর্বল ও অস্পষ্ট বলে মনে করছে। ট্রাম্প নিজেও সাংবাদিকদের বলেছেন, যুদ্ধবিরতি এখন “লাইফ সাপোর্টে” রয়েছে।
ইরান অবশ্য বলছে, তারা যুদ্ধ নয়, বরং নিজেদের সার্বভৌম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। তেহরানের ১৪ দফা প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধ, অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল এবং ইরানের অধিকার স্বীকৃতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
সবচেয়ে বড় উত্তেজনার কেন্দ্র এখন হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়। ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও মার্কিন অবরোধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করেছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
এদিকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এমন একটি প্রস্তাব আনার চেষ্টা করছে, যা বাস্তব পরিস্থিতিকে বিকৃতভাবে তুলে ধরবে। তার ভাষায়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন ও অবৈধ অবরোধ আড়াল করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। এরপর ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করে। এর জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনকার পরিস্থিতি ভয়াবহ যুদ্ধ না হয় পরিপূর্ণ শান্তি-- এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক অস্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউই সরাসরি বড় যুদ্ধ চায় না, কিন্তু কেউই পিছু হটতেও প্রস্তুত নয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন এমন এক অচলাবস্থায় আটকে আছে, যেখানে যুদ্ধবিরতি থাকলেও বাস্তবে উত্তেজনা কমছে না।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন ও তেহরান কি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরও বড় সংঘাতের দিকে যাবে। কারণ হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি নিরাপত্তা, ইসরায়েল-ইরান বৈরিতা এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, সব মিলিয়ে এই সংকট এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিবিএস নিউজ এবং আনাদুলু এজেন্সি