বিশ্লেষণ
পাকিস্তান শব্দটা শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে—অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া, সামরিক শাসনে জর্জরিত ও কট্টরপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত একটি দেশের চিত্র। বিপরীতভাবে একই দেশের নাম শুনলে ক্যানভাসে ফুটে ওঠে—একটি পরমাণু শক্তিধর দেশ, শক্তিশালী সামরিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, ভূরাজনীতিতে পরাশক্তিগুলোর অপরিহার্য মিত্র। একই সঙ্গে বন্ধু ও শত্রুর সঙ্গে সমানতালে গোপন সমঝোতায় সক্ষম একটি দেশের দৃশ্যও। সম্ভবত পাকিস্তানের এই চরিত্র সবচেয়ে ভালো ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসাদ দুররানি। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার কারণে ফায়ার ফক্স নামে পরিচিত এই পাকিস্তানি জেনারেল জানান, কেউ যদি দুই ঘোড়ায় না চড়তে পারে, তবে তার সার্কাসে যোগ দেওয়ার কোনো অর্থ নেই।
পাকিস্তানের এমন দুই ঘোড়ায় চড়ে সার্কাস খেলাটা আরও প্রকাশ্যে এসেছে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আগ্রাসন বন্ধে ইসলামাবাদের নেওয়া ভূমিকায়। ইরানের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী পদক্ষেপ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসলামাবাদ। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গেও দেশটি সমানতালে গোয়েন্দা সহযোগিতা বজায় রেখেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছর জুনে ইরানের ওপর ১৪ দিনের মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আগ্রাসনের সময় আইআরজিসিকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে আইএসআই।
চলমান যুদ্ধের মধ্যেই এপ্রিলের শেষ দিকে পাকিস্তানকে নিজেদের বহরে থাকা চতুর্থ প্রজন্মের মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান উন্নত করার জন্য ৬৮৬ মিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের জে-৩৫ স্টেলথ ফাইটার ক্রয়ের জন্য একটি প্রাথমিক চুক্তি করেছে পাকিস্তান বিমান বাহিনী। যার ফলে বেইজিংয়ের উৎপাদিত এই যুদ্ধবিমানের প্রথম বিদেশি গ্রাহক হতে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। এর আগে, বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নে তুরস্কের সঙ্গে যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কান উৎপাদনের চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে ইসলামাবাদ।
ইরান যুদ্ধে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ভূমিকা মূলত দেখা গেছে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়। এই চুক্তি কার্যকরে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে প্রায়ই আলোচনার বিষয়বস্তুতে আসেন। এর মধ্যেই মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা থেকে ইরানের যুদ্ধবিমানের বহর রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ইসলামাবাদ। দেশটির নূর খান বিমানঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি ইরানি সামরিক বিমান রাখা হয়, যার মধ্যে পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকারী আরসি-১৩০ সামরিক বিমানও রয়েছে। যদিও এই তথ্য অস্বীকার করেছে ইসলামাবাদ। সামরিক সহযোগিতার তথ্য অস্বীকার করলেও যুদ্ধবিরতির মধ্যেই মার্কিন অবরোধ মোকাবেলায় ইরানের অর্থনীতিকে বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি স্থল ট্রানজিট রুট চালু করে পাকিস্তান।
এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান নিজেদের সামরিক সহযোগিতাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের মাধ্যমে। অনেকেই মনে করছেন, কোনো কারণে ইরানের পতন হলে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রভান্ডার ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘাতের সময়। এই সংঘাতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতকে সামরিক প্রযুক্তি সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। এর মধ্যেই, রোববার সিবিএস-এর ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক নষ্ট করতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংঘবদ্ধ প্রচারণার অভিযোগ আনেন।
এর আগে, যুদ্ধবিরতির সময়ে লেবাননে ইসরায়েলি হামলার কড়া সমালোচনা করে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এটিকে ‘শয়তানি এবং মানবতার উপর অভিশাপ’ বলে অভিহিত করেছেন। জবাবে ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সা’আর পাকিস্তান সরকারকে প্রকাশ্য ইহুদিবিদ্বেষী বলে অভিযুক্ত করে জানান, ইসরায়েল তার ধ্বংসের শপথ নেওয়া সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করবে। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট দাবি করেন, সৌদি আরবকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সুন্নি অক্ষশক্তি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে তুরস্ক।
এমন অবস্থায় ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান বৈরিতাকে কেন্দ্র করে আরব বিশ্বের নিজের অবস্থান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী করছে পাকিস্তান। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আরব আমিরাত পাকিস্তানের কাছে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের ঋণ ফেরত চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে সৌদি আরবের কাছ থেকে তিন বিলিয়ন ডলার সহায়তা পায় পাকিস্তান। পাশাপাশি সৌদি আরবে নিজেদের জেএফ-১৭ থান্ডারের একটি বহর মোতায়েন করেছে ইসলামাবাদ, যা রিয়াদের সঙ্গে যৌথ সহযোগিতামূলক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে আরও শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়ার সঙ্গেও রয়েছে পাকিস্তানের শক্তিশালী কৌশলগত সম্পর্ক। দেশটি নিজেদের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের জন্য রাশিয়ার তৈরি আরডি-৯৩এমএ ইঞ্জিন ব্যবহার করছে। পাশাপাশি মস্কোর সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের জ্বালানি সহযোগিতাও রয়েছে ইসলামাবাদের। অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে খনিজ সম্পদ উন্নয়নে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির কথাও জানা যায়। রাশিয়ার পাশাপাশি চীন থেকেও বিপুল আর্থিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সুবিধা উপভোগ করছে ইসলামাবাদ, যা পাকিস্তানকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ময়দানে একটি গ্রেট গেমের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে উপস্থাপন করছে। যারা একই সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমানতালে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গুরুত্ব বজায় রাখার কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বলে প্রমাণ করে।