মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির আবহ তৈরি হলেও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার পারদ এখনো নামেনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। বেইজিং সফরে যাওয়ার আগে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ইরানের বিষয়ে একটাই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তারা যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।
জেরুজালেম পোস্টের লাইভ আপডেটে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখনো কার্যকর রয়েছে। অনেক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মোবাইল লঞ্চারের মাধ্যমে ইরান এখনো দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে ব্যবহার করতে পারছে। ফলে তেহরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি বলেই মনে করছে ওয়াশিংটন।
একই সময়ে লেবানন সীমান্তেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর একাধিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, এসব হামলায় শিশুসহ অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ নতুন ধরনের ড্রোন ব্যবহার শুরু করছে, যেগুলো প্রচলিত ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তিতে থামানো কঠিন। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ড্রোনগুলো ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় সেগুলো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান। দেশটির বিচার বিভাগঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে সরবরাহ করেছিলেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়েও চলছে টানাপোড়েন। ইরান একটি ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে বলেছে, এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য একটি প্রস্তাব। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরান যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ না করে, তাহলে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। সেটি হবে আরও সুবিশাল সামরিক অভিযান।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও পাল্টা কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা আবার হামলা চালালে সমুচিত জবাব দেওয়া হবে। তার ভাষায়, ইরান এখন আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত। আমেরিকাকে যে জবাব দেওয়া হবে তারা তা কল্পনাও করতে পারবে না।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আপাত যুদ্ধবিরতি থাকলেও বাস্তবে অবিশ্বাস, সামরিক প্রস্তুতি এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির রাজনীতি অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকে আবারও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, লেবাননে হিজবুল্লাহর তৎপরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ কৌশল, সবকিছু মিলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে। সবাই এখন তাকিয়ে আছে চীনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের দিকে।
সূত্র: দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, দ্য গার্ডিয়ান ও জেরুজালেম পোস্ট