পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর দ্বন্দ্ব নতুন নয়। একসময় একই রাজনৈতিক শিবিরে থাকা দুই নেতা এখন একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত এবার পৌঁছে গেছে কলকাতা হাইকোর্টে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ এনে তিনি এই মামলা করেছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে উঠে এসেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকাসহ পশ্চিমবঙ্গের একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারে শুভেন্দু অধিকারীর কয়েকটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই মূলত এই আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, শুভেন্দু এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন যা শুধু রাজনৈতিক সৌজন্যের সীমা লঙ্ঘন করেনি, বরং রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও বাড়াতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর বক্তব্য আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে এমন সব মন্তব্য করেছেন যা নির্বাচনী আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে এর আগেও নির্বাচন কমিশনে একাধিক অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না আসায় শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মমতার ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, এটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশোধের মামলা নয়; বরং গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমারেখা টানার একটি প্রচেষ্টা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কারণ, শুভেন্দু অধিকারী এখন শুধু বিজেপির মুখ নন, তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও। অন্যদিকে ক্ষমতা হারানোর পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী বিরোধী কণ্ঠ। ফলে আদালতে এই লড়াই রাজনৈতিকভাবেও বড় বার্তা বহন করছে।
শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য বরাবরের মতো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিজেপি নেতাদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতেই তৃণমূল আদালতকে ব্যবহার করছে। তাদের ভাষ্য, রাজ্যে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ায় এখন আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছে মমতার দল। বিজেপির একাংশের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো পরাজয় মেনে নিতে পারেননি, তাই তিনি রাজনৈতিক সংঘাতকে আদালত পর্যন্ত নিয়ে গেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই সংঘাতের শিকড় আরও গভীরে। শুভেন্দু একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ছিলেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলন থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের রাজনীতিতে দলকে শক্তিশালী করার পেছনে তার বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু পরে বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিনি মমতার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যেতে থাকে। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন, আর দীর্ঘদিনের শাসনের পর ক্ষমতা হারায় তৃণমূল।
এরপর থেকেই দুই পক্ষের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক সভা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির অভিযোগ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, প্রায় সব ইস্যুতেই মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে তৃণমূল ও বিজেপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে এখন রাজনীতি অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, যেখানে মমতা বনাম শুভেন্দুর দ্বন্দ্বই রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ নির্ধারণ করছে।
আইনজীবীদের একাংশ মনে করছেন, এই মামলার শুনানি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। আদালত যদি নির্বাচনী বক্তব্য ও রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ দেয়, তাহলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রচারণায়ও তার প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, অভিযোগ ওঠার পরও কেন কমিশন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ এখন এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে যেখানে আদালত, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন, সবকিছুই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠছে। আর সেই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আইনি পদক্ষেপকে শুধু একটি মামলা হিসেবে নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংঘাতের নতুন অধ্যায় হিসেবেও দেখা হচ্ছে।