বেইজিংয়ে দুই দিনের শীর্ষ বৈঠকের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কড়া বার্তা দিয়েছেন শি। বৈঠকের শুরুতে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে দুই নেতা একে অপরের প্রশংসা করলেও, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।
তাইওয়ান, বাণিজ্য বিরোধ এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধসহ নানা স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে বিভক্ত অবস্থায় এই শীর্ষ বৈঠকে বসে দুই পরাশক্তি। তবে গত বছর ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার কয়েক মাসের টানাপোড়েনের পর ওয়াশিংটন ও বেইজিং সম্পর্কের স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, শি জিনপিং ট্রাম্পকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো তাইওয়ান।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই ইস্যু সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে সম্পর্ক সাধারণভাবে স্থিতিশীল থাকবে। অন্যথায় দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ, এমনকি সরাসরি দ্বন্দ্বও তৈরি হতে পারে, যা পুরো সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।’
এদিকে বৈঠক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।
২০১৭ সালে প্রথম মেয়াদে চীন সফরের পর এবারই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প চীন সফর করছেন। দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে তাইওয়ান অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, ট্রাম্পের অতীতে দেওয়া কিছু মন্তব্যের কারণে মার্কিন আইনপ্রণেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, ট্রাম্প তাইওয়ান ইস্যুতে শি জিনপিংকে ছাড় দিতে পারেন। এর আগে তাইওয়ানকে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অঙ্গীকার করে বেইজিং।
এদিকে গত অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে হওয়া ভঙ্গুর বাণিজ্য সমঝোতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টাও করছেন দুই নেতা।
এর আগে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পৌঁছে হাস্যোজ্জ্বল ট্রাম্পকে স্বাগত জানান শি জিনপিং। সেখানে স্কুলশিক্ষার্থীদের পরিবেশনা ও সামরিক ব্যান্ডের আয়োজন ছিল।
বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে ট্রাম্প তাদের সম্পর্ককে ‘চমৎকার’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, শি জিনপিংয়ের প্রতি তার ‘অনেক সম্মান’ রয়েছে এবং তাকে ‘মহান নেতা’ বলেও অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘কঠিন সময়েও আমরা একসঙ্গে ছিলাম এবং সমস্যার সমাধান করেছি।’
জবাবে শি জানান, বিশ্ব এখন ‘নতুন এক সন্ধিক্ষণে’ পৌঁছেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে দায়িত্বও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত। একে অপরের সাফল্যে সহায়তা করতে হবে এবং নতুন যুগে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সম্পর্কের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।’
বাণিজ্য প্রসঙ্গে শি বলেন, ‘বাণিজ্য যুদ্ধে কোনো বিজয়ী নেই।’ তিনি সাম্প্রতিক আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বুধবার অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় নেতৃত্ব দেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এবং চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হি লিফেং।
বৈঠকে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কথা না বললেও বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প এই সংঘাত নিরসনে চীনের সহায়তা চাইতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
দুই ঘণ্টা ১৫ মিনিটের বৈঠক শেষে দুই নেতা বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক টেম্পল অব হ্যাভেন পরিদর্শন করেন। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আলোচনা ছিল দারুণ। চীন খুব সুন্দর, অসাধারণ জায়গা।’
তাইওয়ান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প কোনো মন্তব্য করেননি। যদিও বেশিরভাগ দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেরও তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তবে ওয়াশিংটন দ্বীপটির সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সমর্থক ও অস্ত্র সরবরাহকারী।
এদিকে, বৃহস্পতিবার রাতে দুই নেতার রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। শুক্রবার সকালে আবার বৈঠকের পর ট্রাম্প ওয়াশিংটনে ফিরবেন।
সূত্র: এনবিসি নিউজ