ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের চাপ তৈরি করে ছাড় আদায়ের কৌশল ব্যবহার করে আসছিলেন। শুল্ক যুদ্ধ, কূটনীতিক হুমকি, প্রকাশ্য অপমান কিংবা সামরিক শক্তির ইঙ্গিত, সব মিলিয়ে ট্রাম্পের রাজনীতি অনেকটা সংঘাতের কিনারায় দাঁড়িয়ে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে পরিচিতি পায়। ইউরোপ, ন্যাটো মিত্র, এমনকি কিছু আরব দেশও অনেক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের চাপে নতি স্বীকার করেছে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এসে সেই কৌশল এবার বড় দেয়ালে আটকে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন গত প্রায় তিন মাস ধরে ইরানকে একের পর এক কঠোর বার্তা দিলেও তেহরান পিছু হটেনি। বরং হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক জোট রাজনীতিকে ব্যবহার করে ইরান উল্টো ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিও নতুন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর ইরান এই পথ কার্যত নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসে। পরে কিছু দেশের জাহাজকে চলাচলের সুযোগ দিলেও মার্কিন মিত্রদের ওপর কড়াকড়ি বজায় রাখে তারা। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় তেলের দাম কয়েক শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে ও বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প শুরুতে দাবি করেছিলেন, কঠোর অবস্থান নিলেই ইরান দ্রুত সমঝোতায় আসবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো হয়েছে। ইরানের নেতৃত্ব বারবার বলছে, তারা অপমানজনক চুক্তি করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভাবমূর্তিও বড় বিষয়। তারা যদি মার্কিন চাপের মুখে নতি স্বীকার করে, তাহলে দেশের ভেতরে নিজেদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই সামরিক ক্ষতি হলেও তেহরান আপাতত দীর্ঘ লড়াইয়ের পথেই হাঁটছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, চাইলে যুক্তরাষ্ট্র দুই দিনের মধ্যে ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে। আবার অন্যদিকে তিনি ২০ বছরের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখার প্রস্তাব মেনে নেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। অর্থাৎ ওয়াশিংটন এখন আগের স্থায়ীভাবে বন্ধ অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয় হওয়ার সংকেত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের বড় সমস্যাটি স্পষ্ট হচ্ছে। একদিকে তারা সর্বোচ্চ চাপ নীতি বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মার্কিন অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে তা সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
চীন ও রাশিয়াও এখন এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বেইজিং প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তবে একই সঙ্গে তারা ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও ধরে রেখেছে। চীন স্পষ্টভাবে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরুই হওয়া উচিত ছিল না। অন্যদিকে রাশিয়াও ইরানকে পুরোপুরি একা ফেলছে না। ফলে ওয়াশিংটনের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অতিরিক্ত বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে অঞ্চলজুড়ে। তবে এত সামরিক শক্তি নিয়েও ওয়াশিংটন এখনো রাজনৈতিক সমাধান বের করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-ও জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত সক্রিয় পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সরাসরি প্রমাণ তারা পায়নি। তবু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে, ইরান দ্রুত পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে। এই বিরোধপূর্ণ অবস্থানই এখন কূটনীতিক সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এদিকে ইরানের ভেতরেও পরিস্থিতি সহজ নয়। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশটি চাপের মধ্যে আছে। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সংঘাতের অভিজ্ঞতার কারণে ইরান এখন সহ্য করে টিকে থাকার কৌশলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ফলে দ্রুত ভেঙে পড়ার বদলে তারা সময়ক্ষেপণের পথ বেছে নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে কেউই পুরোপুরি পিছু হটছে না, আবার বড় যুদ্ধেও জড়াতে চাইছে না। ট্রাম্পের হুমকি, ইরানের পাল্টা অবস্থান, হরমুজ সংকট, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং চীন-রাশিয়ার নীরব সমর্থন, সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন নতুন এক অচলাবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আর এই অচলাবস্থাই দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধুই হুমকি আর চাপের রাজনীতি দিয়ে ইরানের মতো রাষ্ট্রকে সহজে নত করা যাবে না। চাপ দিয়ে নতি স্বীকারের কৌশল বা ফায়দা হাসিলে আমেরিকা বা ট্রাম্পের চেষ্টা এখন পুরোপুরি ব্যর্থ।
সূত্র: রয়টার্স, ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, নিউইয়র্ক পোস্ট