একসময় তারা ছিলেন নিজ দেশের, নিজ বাহিনীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষদের একজন। কারও হাতে ছিল সামরিক গোপন তথ্য, কেউ জানতেন রাষ্ট্রের নজরদারি কৌশল, কেউ বা কাজ করতেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভেতরে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সেই মানুষগুলোর কেউ নিজ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন প্রতিপক্ষের দিকে, কেউ ফাঁস করেছেন রাষ্ট্রের গোপন তথ্য, আবার কেউ প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে বলেছেন, “আমি যা করেছি, বিবেকের তাড়নায় করেছি। বিবেক আমাকে বিশ্বাসঘাতক বানিয়েছে।”
গোয়েন্দা জগতের ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু যারা আছেন, তারা প্রত্যেকেই বিতর্ক, রহস্য আর ভূরাজনীতির বড় চরিত্র হয়ে উঠেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আবার আলোচনায় এসেছে এমনই একটি নাম, মনিকা উইট।
সাবেক মার্কিন বিমান বাহিনীর এই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে ধরিয়ে দিতে সম্প্রতি দুই লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে এফবিআই। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, মনিকা উইট আমেরিকার গোপন সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য ইরানের হাতে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু এই গল্প শুধু একজন পলাতক গোয়েন্দার গল্প নয়। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি একসময় আমেরিকার হয়ে কাজ করলেও পরে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছেন বিবেকের দহনে।
মনিকা উইট ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র বিমান বাহিনীর বিশেষ গোয়েন্দা ইউনিটের সদস্য। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। ফারসি ভাষায় দক্ষ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক অপারেশনগুলোতে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ইরান, আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক-সামরিক বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অনেকেই পরে ব্যক্তিগত জীবনে নিঃশব্দে হারিয়ে যান। কিন্তু মনিকা উইটের ক্ষেত্রে ঘটনা অন্যরকম। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তিনি ধীরে ধীরে মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেন। পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে থাকেন।
২০১৩ সালে তিনি ইরানে যান। এরপর আর ফেরেননি।
কয়েক বছর পর মার্কিন বিচার বিভাগ অভিযোগ আনে, মনিকা উইট শুধু দেশত্যাগ করেননি, বরং ইরানের হয়ে কাজও করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পরিচয়, নজরদারির কৌশল এবং সাইবার অপারেশনের তথ্য ইরানের হাতে তুলে দেন। তার দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে ইরান মার্কিন গোয়েন্দাদের ওপর নজরদারি চালানোর চেষ্টা করেছে বলেও দাবি ওয়াশিংটনের।
তবে এই ঘটনাকে শুধু বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেন না সবাই।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, মনিকা উইটের মধ্যে ধীরে ধীরে আদর্শিক পরিবর্তন এসেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, বেসামরিক বহু মানুষের মৃত্যু, মুসলিম বিশ্বের প্রতি পশ্চিমা আগ্রাসন নীতির সমালোচনা, এসব বিষয় তাকে প্রভাবিত করেছিল। তার ঘনিষ্ঠ কিছু সূত্র দাবি করেছিল, তিনি মনে করতেন আমেরিকার যুদ্ধনীতি অন্যায্য।
এখানেই মনিকা উইটের গল্প অন্য অনেক গোয়েন্দা পক্ষত্যাগীর সঙ্গে মিলে যায়।
বিশ্ব ইতিহাসে বহু আলোচিত গোয়েন্দা কর্মকর্তা আছেন, যারা কোনো না কোনো সময়ে নিজ দেশের গোপন তথ্য প্রকাশ করেছেন বা প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। কেউ অর্থের জন্য, কেউ রাজনৈতিক বিশ্বাসে, কেউ বা ব্যক্তিগত হতাশা থেকে।
এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি এডওয়ার্ড স্নোডেন।
স্নোডেন ছিলেন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএর ঠিকাদারি কর্মী। ২০১৩ সালে তিনি বিশ্বের সামনে এমন কিছু নথি প্রকাশ করেন, যা গোটা বিশ্বকে ভূমিকম্পের মতো নাড়িয়ে দেয়। সেসব নথিতে উঠে আসে, যুক্তরাষ্ট্র শুধু সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নয়, বরং সাধারণ মানুষের ফোনকল, ইন্টারনেট ব্যবহার, ব্যক্তিগত বার্তা সবকিছুর ওপর বিশাল আকারে নজরদারি চালাচ্ছিল যা অনৈতিক।
স্নোডেন দাবি করেছিলেন, জনগণকে সত্য জানানো তার নৈতিক দায়িত্ব ছিল।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করে। তার পাসপোর্ট বাতিল করা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি রাশিয়ায় আশ্রয় নেন। আজও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পারেননি।
চেলসি ম্যানিংয়ের ঘটনাও একইভাবে বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
মার্কিন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করার সময় তিনি লাখ লাখ সামরিক নথি ও কূটনৈতিক বার্তা ফাঁস করে দেন। সেই নথির মধ্যে ছিল ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহ ভিডিও, যেখানে হেলিকপ্টার হামলায় সাধারণ মানুষ নিহত হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
ম্যানিং বলেছিলেন, যুদ্ধের বাস্তবতা মানুষকে জানানো প্রয়োজন ছিল।
তাকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার পক্ষে কথা বলতে শুরু করে। কেউ তাকে অপরাধী বলেছেন, কেউ বলেছেন হুইসলব্লোয়ার বা সত্য প্রকাশকারী।
গোয়েন্দা ইতিহাসের আরেক বিখ্যাত নাম ওলেগ গর্দিয়েভস্কি। তিনি ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভয়ঙ্কর গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির কর্মকর্তা। কিন্তু গোপনে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করতেন। শীতল যুদ্ধের সময় তিনি পশ্চিমাদের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের বহু গোপন তথ্য পৌঁছে দেন।
পরে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নাটকীয়ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পালিয়ে ব্রিটেনে আশ্রয় নেন।
আবার ব্রিটিশ ইতিহাসে কেমব্রিজ ফাইভ নামে পরিচিত একদল গোয়েন্দা কর্মকর্তার গল্প এখনো আলোচিত। তারা ব্রিটিশ অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে এসে সরকারি উচ্চপদে কাজ করলেও গোপনে সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে তথ্য পাচার করতেন। শীতল যুদ্ধের সময়ে তাদের কর্মকাণ্ড পশ্চিমা বিশ্বকে বড় ধাক্কা দেয়।
এই সব গল্পের ভেতরে একটি সাধারণ প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে, কেন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিজের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ান?
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিন গোপন অপারেশনে কাজ করা মানুষদের মধ্যে মানসিক পরিবর্তন তৈরি হতে পারে। তারা রাষ্ট্রের এমন কিছু দিক দেখতে পান, যা সাধারণ মানুষ জানে না। কখনো আদর্শ বদলায়, কখনো জন্ম নেয় হতাশা, কখনো ক্ষমতা বা অর্থের লোভও কাজ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক বিশ্বে পক্ষত্যাগী গোয়েন্দারা শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকি নয়, বরং বড় রাজনৈতিক অস্ত্রও। কারণ একজন অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা শত্রুপক্ষকে যে তথ্য দিতে পারেন, সেটি অনেক সময় যুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
মনিকা উইটের ঘটনাও সেই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
বিশেষ করে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। পারমাণবিক কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, সাইবার হামলা, নিষেধাজ্ঞা, সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ চলছে বহু বছর ধরে।
এমন পরিস্থিতিতে একজন সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার ইরানে অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। তবে আরেকটি বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলছে, যাদের একসময় রাষ্ট্র বিশ্বাসঘাতক বলেছে, সময়ের ব্যবধানে তাদের কেউ কেউ পরে সত্য প্রকাশকারী হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।
এডওয়ার্ড স্নোডেনের উদাহরণই সবচেয়ে বড়। একসময় তাকে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার শত্রু বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে বিশ্বের বহু মানুষ তাকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার রক্ষক হিসেবে দেখেছে।
চেলসি ম্যানিংও একইভাবে বিতর্কিত কিন্তু আলোচিত।
মনিকা উইটের ক্ষেত্রে অবশ্য পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ তার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। তাই তাকে অনেক বেশি কঠোরভাবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তবুও প্রশ্নটি থেকেই যায়, এই মানুষগুলো কি কেবল রাষ্ট্রদ্রোহী? নাকি তারা এমন কিছু দেখেছিলেন, যা তাদের বিবেককে বদলে দিয়েছিল?
হয়তো এর উত্তর একেক জনের কাছে একেক রকম হবে।
কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, গোয়েন্দা জগতের এই পক্ষত্যাগীরা ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং বিতর্কিত চরিত্রদের মধ্যে থাকবেন সবসময়। আর সেই তালিকায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে মনিকা উইটের নাম।
সূত্র: ইন্টারনেট