শ্রীলঙ্কার তামিলদের প্রতি সংহতি জানাতে গিয়ে ফের এলটিটিই প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের প্রসঙ্গ তুলে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিলেন তামিলনাড়ুর নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বিজয় থালাপতি। তামিল এই অভিনেতা কাম রাজনীতিক সি জোসেফ বিজয় নামেও পরিচিত। বিজয়ের বক্তব্য ঘিরে ভারত ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
তামিল জনগোষ্ঠীর অধিকার ও শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের সময়কার নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে বিজয় বলেন, ‘তামিলদের আত্মমর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না।’ এ সময় তিনি প্রভাকরণের নাম উল্লেখ করলে বিরোধী মহল থেকে সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের দাবি, তিনি পরোক্ষভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন এলটিটিইকে ঘিরে আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছেন।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বিজয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য তামিল জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে কাচ্চাতিভু দ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার তামিলদের নিরাপত্তা ইস্যুতে তার অবস্থান দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ বিজয়ের মন্তব্যকে নির্বাচনী বক্তব্য বলে উড়িয়ে দেন। শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর জানায়, কলম্বোয় মন্ত্রিসভার ব্রিফিংয়ে হেরাথ বলেন, কাচ্চাতিভু শ্রীলঙ্কার অংশ ছিল, আছে এবং থাকবে। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ ভারতের নির্বাচনের সময় এমন বক্তব্য নতুন কিছু নয়।
ভারতের কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, বিজয় তার নতুন রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে তামিল আবেগকে সামনে আনছেন। অন্যদিকে সমর্থকদের ভাষ্য, তিনি কোনো সশস্ত্র আন্দোলনের পক্ষে নন; বরং শ্রীলঙ্কার তামিলদের মানবাধিকার ও রাজনৈতিক মর্যাদার প্রশ্ন তুলেছেন।
শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় তামিলদের ওপর সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে বহুবার আলোচিত হয়েছে। সেই ইতিহাসের কারণেই তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে শ্রীলঙ্কার তামিল ইস্যু এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আবেগঘন একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের মে মাসে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী ঘোষণা দেয়, প্রভাকরণ নিহত হয়েছেন এবং এর মধ্য দিয়ে ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছে। সে সময় শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের মুল্লাইতিভু এলাকায় চূড়ান্ত সামরিক অভিযানে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়। তবে কলম্বো সরকার বরাবরই বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
প্রভাকরণকে নিয়ে আজও মতভেদ তীব্র। কারও কাছে তিনি স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা এক গেরিলা নেতা, আবার কারও কাছে তিনি ভয়ংকর সশস্ত্র সংগঠনের প্রধান। কিন্তু তার নাম যে এখনও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আবেগ, বিতর্ক ও ইতিহাসের এক জটিল প্রতীকে পরিণত হয়ে আছে, বিজয় থালাপতির সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, ডেইলি মিরর শ্রীলঙ্কা, মানিকন্ট্রোল ইন্ডিয়া।