ইরানের সঙ্গে গায়ে পড়ে যুদ্ধ বাধানো এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। নতুন রয়টার্স-ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের কাজের প্রতি সন্তুষ্ট। হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করার পর এটিই তার সবচেয়ে বাজে জনপ্রিয়তার রেটিংগুলোর একটি।
জেরুজালেম পোস্টে প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপরও। দেশটিতে জ্বালানির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি এখন ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করছে। জরিপে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময় যেখানে ৯১ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক তার পাশে ছিলেন, এখন সেই সমর্থন কমে দাঁড়িয়েছে ৭৯ শতাংশে। রিপাবলিকানদের একাংশ মনে করছে, যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির কারণে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলটি সমস্যায় পড়তে পারে।
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় অন্তহীন বা দীর্ঘ যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন ইরান সংঘাত তাকে নতুন রাজনৈতিক চাপে ফেলেছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সফল হয়েছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা শক্তিশালী হয়েছে। তার প্রশাসনের ভাষ্য, এই অভিযানে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর বড় ক্ষতি হয়েছে।
তবে মার্কিন জনগণের বড় অংশ এখনও এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে না। জরিপ অনুযায়ী, মাত্র এক-চতুর্থাংশ আমেরিকান মনে করেন ইরানে সামরিক অভিযান সার্থক ছিল। এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও এ নিয়ে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করছেন ৬২ শতাংশ রিপাবলিকান, কিন্তু ২৮ শতাংশ সরাসরি অসন্তোষও প্রকাশ করেছেন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও এখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি। এপ্রিল থেকে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইরান এখনও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করছে। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে পরিস্থিতি আবার খারাপ হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেরুজালেম পোস্টের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে বলা হচ্ছে, ইরান যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত নয়; এটি এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা, গাজা পরিস্থিতি, হিজবুল্লাহ ও আঞ্চলিক জোট রাজনীতির ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের সামরিক ফলাফল নিয়ে হোয়াইট হাউস ইতিবাচক বার্তা দিলেও সাধারণ আমেরিকানদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, এই সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য কতটা এবং এর শেষ কোথায়।
সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট, রয়টার্স, ইপসোস জরিপ