ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ও দেশটির শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পর যুদ্ধ-পরবর্তী তেহরানের ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের একটি অত্যন্ত গোপন ও চাঞ্চল্যকর পরিকল্পনা ফাঁস হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের একটি বিশেষ প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে দেশটির শাসনভারের প্রধান হিসেবে বসানোর একটি সুদূরপ্রসারী ও ঝুঁকিপূর্ণ রেজিম চেঞ্জ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জুয়া খেলেছিল। তবে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে শুরুর পরপরই এই গোপন মিশনটি পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েল ও আমেরিকার এই যৌথ ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা কেবল ইরানের পরমাণু স্থাপনা বা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পুরো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুদ্ধের প্রথম দিনই তেহরানে আহমাদিনেজাদের নিজস্ব বাসভবনে একটি সুনির্দিষ্ট ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলার উদ্দেশ্য আহমাদিনেজাদকে হত্যা করা ছিল না, বরং তাকে ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) নজরদারি ও গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা ছিল, যাতে পরবর্তী সময়ে তাকে বিদেশী মদদপুষ্ট একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয়তাবাদী মুখ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
হামলায় আহমাদিনেজাদ সামান্য আহত হলেও বেঁচে যান, তবে ইসরায়েলের এই অদ্ভুত ও চরম পদক্ষেপের পর তিনি মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের এই পরিকল্পনার প্রতি পুরোপুরি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন এবং নিজেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে নেন। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, তা রহস্যময়।
অথচ এক সময় পশ্চিমা বিশ্বে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ছিলেন অন্যতম প্রধান শত্রু, যিনি ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন, হলোকাস্ট বা ইহুদি নিধনযজ্ঞ অস্বীকার করেছিলেন এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে তীব্র গতিতে বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে ইরানের কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতাদের সাথে তার তীব্র দূরত্ব তৈরি হয় এবং ২০১৭, ২০২১ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাকে বারবার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল, আহমাদিনেজাদ কোনো পশ্চিমাঘেঁষা মডারেট নেতা না হলেও, ইরানি জনগণের মধ্যে তার একটি নিজস্ব জাতীয়তাবাদী জনভিত্তি রয়েছে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ভঙ্গুর ইরানকে স্থিতিশীল করতে তিনিই একমাত্র শক্তিশালী বিকল্প হতে পারেন।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধাপগুলোর মধ্যে ছিল ব্যাপক বিমান হামলা, শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা, ইরানের সীমান্ত অঞ্চলে কুর্দিদের সশস্ত্র বিদ্রোহ উসকে দেওয়া এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো। কিন্তু এই পুরো ছকটি বাস্তবায়নে মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের মানসিকতাকে মারাত্মকভাবে ভুল মূল্যায়ন করেছিলেন।
খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যার পরও ইরানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি এবং বিদেশি শক্তির মদদে দেশের ভেতরে কোনো গণ-অভ্যুত্থান তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আড়ালে থাকা এই বিশাল ভূ-রাজনৈতিক জুয়া ব্যর্থ হওয়ার পর, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া অবশ্য এখনো দাবি করছেন, ইরানকে অস্থিতিশীল করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে এখনো সফল হওয়া সম্ভব।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নিজেদের মতো করে নতুন করে লেখার এই মার্কিন-ইসরায়েলি জুয়া হেরে গেছে। তেহরানের অনমনীয় অবস্থানের কাছে মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এই পরিকল্পনা আর নতুন করে কাজে দেবে বলে মনে হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নিজেদের মতো করে নতুন করে আঁকার যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু করেছিলেন, তা বর্তমান বাস্তবতার কঠোর মুখোমুখি হয়েছে। ইরানকে বলপ্রয়োগ বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নতজানু করার এই ব্যর্থ চেষ্টা প্রমাণ করে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ একক কোনো পরাশক্তি বা জোটের ইচ্ছায় রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এই কৌশলগত পিছুটান কেবল ইরানকেই আঞ্চলিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়নি, বরং সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি একচ্ছত্র আধিপত্যের ধারণাকে এক বড় ধরনের পুনর্মূল্যায়নের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সূত্র: গালফ নিউজ