কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় তিন দশক পুরনো একটি বিতর্কিত বিমান ভূপাতিতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। বিষয়টি সামনে আসার পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কিউবান নির্বাসিত সংগঠন ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ-এর দুটি ছোট বিমানকে কিউবার যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছিল। ওই ঘটনায় চারজন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, বিমানগুলো আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় ছিল এবং সেগুলোকে ভূপাতিত করা ছিল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। তবে কিউবার দাবি, বিমানগুলো বারবার তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করছিল এবং সেটি ছিল দেশের নিরাপত্তা রক্ষার পদক্ষেপ।
সে সময় রাউল কাস্ত্রো ছিলেন কিউবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মনে করছে, ওই অভিযানের পেছনে তার সরাসরি ভূমিকা বা অনুমোদন ছিল। এ জন্য মায়ামিতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উন্মোচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি গ্র্যান্ড জুরির অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রকাশ করা হতে পারে।
এই ঘটনাকে শুধু পুরোনো একটি মামলা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের কিউবার ওপর নতুন চাপ তৈরির কৌশলের অংশ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কিউবার অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি ঘাটতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ওয়াশিংটন দেশটির কমিউনিস্ট নেতৃত্বকে আরও চাপে ফেলতে চাইছে।
একই দিনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার জনগণের উদ্দেশে স্প্যানিশ ভাষায় একটি ভিডিও বার্তা দেন। সেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার জনগণের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়তে চায়। তিনি খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে ১০ কোটি ডলারের প্রস্তাবও দেন। তবে শর্ত হচ্ছে, এই সহায়তা কিউবা সরকারের মাধ্যমে নয়, চার্চ বা স্বাধীন মানবিক সংস্থার মাধ্যমে বিতরণ করতে হবে।
কিউবা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই দাবি করছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রুদ্রিগেজ পারিলা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কিউবাকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। হাভানার অভিযোগ, ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক অবরোধই দেশটির জ্বালানি ও খাদ্য সংকটের বড় কারণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলা বাস্তবে আদালত পর্যন্ত গড়াবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। কারণ ৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো কিউবাতেই অবস্থান করছেন এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তরের সম্ভাবনা খুবই কম। তবে প্রতীকী দিক থেকে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোর ওপর কঠোর বার্তা দিতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বরাবরই বৈরিতাপূর্ণ। ১৯৫৯ সালের কিউবান বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাত চলে আসছে। যদিও বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় কিছুটা সম্পর্কের উন্নতি হয়েছিল, পরে আবার নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে যায়। এখন রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য এই মামলা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।