বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থায় আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকায় চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এল নিনো ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর প্রভাব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, টাইফুন, বৃষ্টিপাত, খরা ও তাপপ্রবাহের ধরনও বদলে যেতে পারে।
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ হয়ে ওঠার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে গোটা পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ব্যবস্থায়। ফলে কোথাও অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা ও দাবদাহ তৈরি হয়। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন মহাসাগরে সৃষ্ট গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও শক্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর সময় আটলান্টিক মহাসাগরে সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কমে যায়। কারণ বায়ুমণ্ডলে উল্লম্ব বায়ুপ্রবাহের পার্থক্য বা উইন্ড শিয়ার বৃদ্ধি পায়, যা ঝড়কে শক্তিশালী হতে বাধা দেয়। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেখানে ঝড় ও হারিকেন আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে এল নিনো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দ্রুত বেড়েছে। বিভিন্ন জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এমন হারে বাড়ছে যে বছর শেষ হওয়ার আগেই একটি মাঝারি থেকে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের অধীনস্থ ডব্লিউএমও সতর্ক করেছে, এল নিনো ফিরে এলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। এর সঙ্গে এল নিনো যুক্ত হলে তাপপ্রবাহ, দাবানল, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও কৃষি সংকট আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ২০২৭ সাল নতুন বৈশ্বিক উষ্ণতার রেকর্ড গড়তে পারে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্যও পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী এল নিনোর সময় ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে এবং খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার বিশ্বের অন্য অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হতে পারে। আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি এলাকায় অতিবৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
এল নিনোকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, এটি এখন আর একা কাজ করছে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ইতোমধ্যে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। ফলে এল নিনোর স্বাভাবিক প্রভাবও আগের তুলনায় আরও তীব্র হয়ে দেখা দিতে পারে। যে বন্যা একসময় মাঝারি ছিল, তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। যে তাপপ্রবাহ একসময় কয়েক দিনের ছিল, তা সপ্তাহজুড়ে স্থায়ী হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে কৃষি, খাদ্য সরবরাহ, পানি ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য খাত এখন থেকেই সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। জাতিসংঘ বলছে, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না এবারের এল নিনো কতটা শক্তিশালী হবে। তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসগুলো একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি আবারও পৃথিবীর আবহাওয়ার নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। আর তার প্রভাব অনুভূত হবে আটলান্টিকের হারিকেন অঞ্চল থেকে শুরু করে এশিয়ার মৌসুমি বৃষ্টিপাত, আফ্রিকার কৃষিক্ষেত্র ও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত।
সূত্র: আল জাজিরা, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও), রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস