ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে তেহরানের একটি গোপন স্থানে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকের সময় তিনি খামেনিকে দেখতে পাননি।
পরে তিনি জানতে চান, যে কণ্ঠস্বর শুনেছেন, সেটি সত্যিই সর্বোচ্চ নেতার ছিল কি না। পুরো ঘটনায় অপমানিত বোধ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
গতকাল বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করেছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র কয়েক মিনিটের ওই বৈঠক শেষে পেজেশকিয়ানকে চলে যেতে বলা হয়। খামেনির নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে করমর্দনেরও সুযোগ দেননি।
অবশ্য গত মে মাসে ইরানের বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধিদের এক সমাবেশে পেজেশকিয়ান ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছিলেন।
তিনি সেসময় দাবি করেছিলেন, মোজতবা খামেনির সঙ্গে তিনি আড়াই ঘণ্টা ধরে ‘আন্তরিক পরিবেশে' বৈঠক করেছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, দীর্ঘদিনের চেষ্টার পর পেজেশকিয়ান ওই বৈঠকের সুযোগ পান, যা সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে এক ধরনের ‘ছাড়’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বারবার বৈঠকের অনুরোধ এবং পদত্যাগের হুমকির পর খামেনির কার্যালয় শেষ পর্যন্ত বৈঠকে সম্মত হয়। তবে প্রচলিত নিয়ম ভেঙে বৈঠকটি সর্বোচ্চ নেতার বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়নি।
পেজেশকিয়ানকে তার নিরাপত্তা দল তেহরানের একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে নিজের গাড়ি থেকে নামিয়ে কালো কাচে ঢাকা একটি বাণিজ্যিক গাড়িতে তোলা হয়, যেখানে আগে থেকে খামেনি অপেক্ষা করছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গাড়ির ভেতরটা এতটাই অন্ধকার ছিল যে, দুজনের কেউ কাউকে দেখতে পাননি।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরো ঘটনাকে পেজেশকিয়ান অপমানজনক বলে মনে করেছিলেন। পরে তিনি জানতে চান, যার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, তিনি সত্যিই সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন কি না।
এরপর পেজেশকিয়ান খামেনির বাসভবনে দ্বিতীয়বার বৈঠকের অনুরোধ জানালেও তা নাকচ করে দেওয়া হয়।
পেজেশকিয়ানকে ‘চূড়ান্ত আলটিমেটাম’
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে পেজেশকিয়ান একাধিকবার পদত্যাগের হুমকি দিয়েছিলেন। মে মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগেরও আবেদন করেন।
তার অভিযোগ ছিল, জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত থেকে তার সরকারকে পুরোপুরি দূরে রাখা হয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, মোজতবা খামেনি প্রেসিডেন্টকে ‘চূড়ান্ত আলটিমেটাম’ দিয়েছেন এবং আলোচনা ও চলমান সংঘাত-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার আহমাদ ভাহিদির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪-এর দাবি, খামেনির এই অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, তিনি পুরোপুরি ইরানের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে একমত। ফলে কৌশলগত নীতিনির্ধারণে প্রেসিডেন্টের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে।
পাঁচ মাস ধরে প্রকাশ্যে নেই মোজতবা
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি।
এরপর প্রায় পাঁচ মাস ধরে তিনি প্রকাশ্যে দেখা দেননি বা কোনো বক্তব্যও দেননি।
এসময় খামেনির কেবল লিখিত বিবৃতি প্রকাশ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে তার স্থিরচিত্র ব্যবহার করে সেসব বিবৃতি পাঠ করা হয়।
গত জুলাইয়ে এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছিলেন, ‘এই সময়ে আমিও মোজতবা খামেনিকে দেখিনি। খুব সীমিতসংখ্যক মানুষের তার সঙ্গে দেখা হয়েছে।’