ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। উত্তাল এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বৃহত্তম মসজিদগুলোর কয়েকটিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা নতুন করে দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। আগুনের লেলিহান শিখায় মসজিদটি পুড়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, বৃহত্তম একটি মসজিদের আশপাশে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন। তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ আন্দোলনের মুখে থাকা ইরানে এই দৃশ্য বিদ্যমান অস্থিরতাকে আরও গভীর করে তুলেছে।
ভিডিওটি শেয়ার করেন ইরানি মানবাধিকারকর্মী ও নির্বাসিত সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদ। সোশ্যাল হ্যান্ডেল এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, বিদ্রোহের সময় ইরানের বৃহত্তম মসজিদগুলোর একটি পুড়ে গেছে। তিনি এটিকে ‘বিশৃঙ্খলা’ নয়, বরং ‘৪৭ বছরের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
আলিনেজাদের দাবি, গত চার দশকের বেশি সময় ধরে ইসলামপন্থী শাসনের অধীনে অসংখ্য নিরীহ ইরানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবারের ভিডিওতে তেহরানের ঘোলহাক ও সাদাত আবাদ পাড়ার মসজিদগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, ইরানের মুদ্রার পতনের হতাশা ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহর ও শহরে বিক্ষোভের সূত্রপাত করেছে।
গত ৩ জানুয়ারির পর থেকে চলমান বিক্ষোভ নিয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন। শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘ভাঙচুরকারী’ ও ‘নাশকতাকারী’ বলে আখ্যা দেন।
ভাষণে খামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্পের হাত ‘এক হাজারেরও বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত’। এতে তিনি স্পষ্টভাবে গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের দিকে ইঙ্গিত করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছিল এবং নিজেও হামলায় অংশ নিয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
খামেনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অহংকারী’ নেতৃত্ব একদিন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ইরান শাসনকারী রাজবংশের মতোই উৎখাত হবে। তিনি দাবি করেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ‘লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নাশকতার মুখে পিছু হটবে না।
অন্যদিকে, ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি চলমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে সৃষ্ট বিদ্রোহের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে।
সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট জানায়, তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরানে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নতুন করে উত্তেজনা বেড়েছে। রেজা পাহলভির বক্তব্যের পর ক্ষুব্ধ নাগরিকদের মধ্যে সরকারবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এই সপ্তাহের শুরুতে দ্বিতীয় দফা বিক্ষোভ শুরু হয়।
এই প্রতিবাদকে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত মাসে তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার থেকে এর সূচনা হয়। সে সময় দোকানিরা দেশটির জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।