উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরে চলতি মৌসুমে গমের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া আর কৃষি বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে গমের আবাদ হয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তির এই খরতাপের মধ্যেই মাঠজুড়ে এখন সোনালি গমের সমারোহ। জেলার ১৩টি উপজেলাতেই পুরোদমে শুরু হয়েছে গম কাটা ও মাড়াইয়ের উৎসব। আগাম বর্ষা ও ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কায় কৃষকরা দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ৭ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৮৭ হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮১২ হেক্টর বেশি। গত বছর আবাদ হয়েছিল ৬ হাজার ৫৭১ হেক্টর জমি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গমের আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ পেকে যাওয়া গমের সোনালি রঙে ছেয়ে আছে। সদর উপজেলার নশিপুর গ্রামের কৃষক মোমিনুল ইসলাম জানান, তিনি এবার এক একর জমিতে গম চাষ করে ৪৯ মণ ফলন পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে গমের চাহিদা ও দাম দুটোই ভালো। কৃষি বিভাগ যদি উন্নত বীজ ও পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকে, তবে আগামীতে আমরা আরও বেশি জমিতে আবাদ করব।’
একই চিত্র বিরল উপজেলার ফারাক্কাবাঁধ গ্রামেও। কৃষক আব্দুল মজিদ ৭৫ শতক জমিতে আবাদ করে ৩৮ মণ গম ঘরে তুলেছেন। তিনি জানান, কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে জমি তৈরি ও বীজ রোপণ করায় এবার ফলন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকরা এখন কম পরিশ্রমে বেশি লাভের আশায় আধুনিক জাতের দিকে ঝুঁকছেন। বারি-২৫, ২৬, ২৮, ৩০ এবং ৩১ জাতের গমের ফলন প্রতি বিঘাতে (৩৩ শতক) ১৬ থেকে ১৮ মণ পর্যন্ত হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে গম চাষে খরচ হচ্ছে ৬ থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা, যা অন্য ফসলের তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী।
দিনাজপুর কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, অনুকূল আবহাওয়া এবং মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শের ফলে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ঝড়ের আশঙ্কায় আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সব গম মাড়াই শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
দিনাজপুর গম গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক মো. আরিফুজ্জামান বলেন, গমের আমদানিনির্ভরতা কমাতে আমরা কৃষকদের উন্নত মানের বীজ সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হওয়া তারই প্রতিফলন।
হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজিনা বেগম জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার কৃষকদের সার, বীজ ও প্রণোদনা দিচ্ছে। ধান চাষের পাশাপাশি গম চাষে কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ঝড়-বৃষ্টির আগেই সোনালি ফসল ঘরে তুলতে পারলে দিনাজপুরের অর্থনীতিতে এবার গমের বড় অবদান থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।