মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ নদীর ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনপদ। সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়ন এবং কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী কয়েকটি গ্রামের শতাধিক পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের পর থেকেই নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. এনামুল আকন জানান, একসময় প্রায় ১০ বিঘা আবাদি জমিতে কৃষিকাজ করে স্বচ্ছলভাবে সংসার চালাতেন। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর ধীরে ধীরে নদী তাদের জমি গ্রাস করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বসতভিটাসহ পারিবারিক ভাগে পাওয়া দুই বিঘা জমিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে পরিবার নিয়ে অন্যের আট শতাংশ জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
এনামুল আকনের দাবি, নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের পর থেকেই ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তবে প্রভাবশালীদের ভয়ে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতেও ভয় পান বলে জানান তিনি।
একই গ্রামের টিটল আকনও নদীভাঙনে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে অন্যত্র নতুন করে ঘর নির্মাণ করেছেন। তার অভিযোগ, আগে এলাকায় এমন ভয়াবহ নদীভাঙন ছিল না; ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন শুরুর পর পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরবর্তী হোগলপাতিয়া, চরহোগলপাতিয়া, চর কালকিনি, সস্তাল ও কাদের আকন কান্দিসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতি বছরই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাটবাজার। নদীর কিনারায় বসবাসকারী পরিবারগুলো প্রতিটি বর্ষা মৌসুমে নতুন করে ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জলিল বেপারী বলেন, রাতভর ড্রেজারের শব্দে এলাকায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রতিবাদ করতে গেলে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও করেন তিনি।
শাহানুর আকন, সিদ্দিকী আকন, আজম হাওলাদার ও রাজ্জাক হাওলাদারসহ একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, অবৈধ ড্রেজারে বালু উত্তোলনের পর থেকেই নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অনেক পরিবার পাঁচ থেকে সাতবার পর্যন্ত ঘর সরাতে বাধ্য হয়েছে। তাদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে পুরো জনপদই একসময় নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসাইন অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদারের চাচাতো ভাই জাফর হাওলাদার অভিযোগ করেন, নদীর পাড়ের মাটি ড্রেজার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করায় তাদের আম ও বরই বাগান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাধা দেওয়ায় তাকে হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
হোগলপাতিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লোকমান বেপারী বলেন, অভিযোগে যাদের নাম আসছে তারা প্রভাবশালী হওয়ায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে অনেকেই ভয় পান।
অভিযোগের বিষয়ে আলিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহিদ পারভেজের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদার বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তবে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ তিনি পাননি বলে দাবি করেন।
মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান জানান, ঝাউদি ইউনিয়নে নদীতীর সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের পরিদর্শন শেষে প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।
মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসক মিস মর্জিনা আক্তার বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পৃথক ম্যাজিস্ট্রেট টিম নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ অভিযান চলবে।