একসময় টাঙ্গাইলের গ্রামজুড়ে তাঁতের খটখট শব্দই ছিল জীবিকার সুর। সেই শব্দে মুখর থাকত জনপদ, আর টাঙ্গাইল শাড়ির সুনাম ছড়িয়ে পড়ত দেশ-বিদেশে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য আজ অস্তিত্বের সংকটে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ, অথচ বাড়েনি তাঁতিদের মজুরি। ফলে সংসারের চাকা সচল রাখতে পূর্বপুরুষের শত বছরের পেশা ছেড়ে রিকশা, অটোরিকশা চালানো, চায়ের দোকান কিংবা দিনমজুরির মতো পেশায় ঝুঁকছেন অনেক তাঁতি।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) টাঙ্গাইল শাড়িকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প নানা সংকটে ধুঁকছে।
সরেজমিনে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন তাঁতপল্লি ঘুরে দেখা গেছে, সুতা, রং ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় শাড়ি উৎপাদনের ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বাড়েনি। সপ্তাহজুড়ে কঠোর পরিশ্রম করে দুই থেকে তিনটি শাড়ি বুনেও যে আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাজিতপুর এলাকার তাঁতি শিথিল বসাক বলেন, ‘তাঁত বুনে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই সব তাঁত বিক্রি করে দিয়েছি। এখন অটোরিকশা চালাই, পাশাপাশি তাঁতঘরে চায়ের দোকান করেছি। এই কাজ না করলে পরিবার চালানো সম্ভব হতো না।’
একই এলাকার তাঁতি রাম দুলাল বসাক বলেন, ‘আগে একটি শাড়ি বুনতে তিন থেকে চার দিন লাগলেও তখন হাতে বোনা শাড়ির মূল্য ছিল। কিন্তু এখন পাওয়ার লুমে দিনে ১৫ থেকে ২০টি শাড়ি তৈরি হচ্ছে। সেই প্রতিযোগিতায় হস্তচালিত তাঁত টিকতে পারছে না।’
কার্তিক বসাক নামে আরেক তাঁতি জানান, অল্প মজুরির কারণে তিনি তাঁতের কাজ ছেড়ে চায়ের দোকান দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘তাঁতের মজুরিতে সংসার চলে না। তাই বাধ্য হয়ে অন্য ব্যবসায় নেমেছি।’
নলসুধা এলাকার তাঁতি উজ্জ্বল তরফদার বলেন, ‘একটি টাঙ্গাইল জামদানি শাড়ি বুনতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। একটি শাড়ির জন্য মজুরি পান ৮৫০ টাকা। সপ্তাহে দুই-তিনটির বেশি শাড়ি তৈরি করা সম্ভব হয় না। ফলে আয় দিয়ে কোনোভাবেই সংসারের ব্যয় মেটানো যায় না।’
অন্যদিকে, বাজারে পাওয়ার লুমে তৈরি কম দামের শাড়ির দাপটে হস্তচালিত তাঁতের শাড়ির চাহিদাও কমছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
পাথরাইল এলাকার শাড়ি ব্যবসায়ী সুবির বসাক বলেন, হাতে বোনা কাপড়ের এখনও আলাদা কদর রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় এর দামও বেশি পড়ে। একই ডিজাইনের শাড়ি পাওয়ার লুমে অনেক কম খরচে তৈরি হওয়ায় ক্রেতারা সেদিকেই ঝুঁকছেন। এতে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে।
টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বলেন, বাজারে টাঙ্গাইল শাড়ির নামে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি পাওয়ার লুমের শাড়ি বিক্রি হচ্ছে। এতে প্রকৃত টাঙ্গাইল শাড়ির সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং স্থানীয় তাঁতিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘শাড়ির দাম কমে যাওয়ায় তাঁতিদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে দক্ষ কারিগররা একে একে পেশা ছাড়ছেন। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল তাঁত শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’
তাঁতিদের পাশাপাশি লোকসানের মুখে পড়ে অনেক ছোট ও মাঝারি তাঁত মালিকও তাদের কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দক্ষ কারিগরের সংকটে অনেক সচল তাঁতও এখন অচল হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের টাঙ্গাইল বেসিস সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার জায়দুর রহমান বলেন, কম পারিশ্রমিকের কারণে নতুন প্রজন্ম হস্তচালিত তাঁত পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী তাঁতের সংখ্যা।
তিনি জানান, হস্তচালিত তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও বিপণন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে তাঁতিদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হয়েছে। পাশাপাশি টাঙ্গাইলে একটি শাড়ি বিপণন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
তাঁত বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল সদর, বাসাইল ও দেলদুয়ারসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার হস্তচালিত তাঁত চালু রয়েছে, অচল রয়েছে প্রায় তিন হাজার তাঁত। অন্যদিকে পাওয়ার লুমের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজার। কম দামে বেশি উৎপাদনের কারণে পাওয়ার লুমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে হস্তচালিত তাঁত শিল্প।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, বাজারে প্রকৃত টাঙ্গাইল শাড়ির সুরক্ষা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প।