বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২.১ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের অভাবে ভুগছে এবং চার বিলিয়ন মানুষ বছরে অন্তত এক মাস পানির তীব্র সংকটে পড়ে। এই সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নারী ও মেয়েদের ওপর, যারা প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘণ্টা পানি সংগ্রহে ব্যয় করে। বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব তথ্য তুলে ধরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ডিপিএইচইর প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল আওয়াল।
সেমিনারে বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, দেশে ৮৬ শতাংশ পরিবারে নারী ও মেয়েরাই পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে, যেখানে অনেকেই প্রতিদিন ৩০ মিনিট পর্যন্ত সময় ব্যয় করে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, শিল্প দূষণ, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন বন্যা ও খরার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এর ফলে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপ বাড়ছে, যা তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সেমিনারে পানি ও জেন্ডার বিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরিন। তিনি বলেন, নিরাপদ পানির অভাব কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, এটি একটি লিঙ্গসমতার সংকট। নারীদের ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
এনজিও ফোরামের নির্বাহী পরিচালক এস. এম. এ. রশিদ বলেন, পানি খাতে বৈষম্য কমানো অত্যন্ত জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পানি ব্যবস্থাপনায় নারী ও মেয়েদের কেন্দ্রে আনতে হবে, যাতে তাদের মতামত, নেতৃত্ব ও অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, পানিই জীবন, তবে পানির সংকট এখন বৈশ্বিক সমস্যা। নিরাপদ পানির উৎস দিন দিন কমে যাচ্ছে, বিশেষ করে ঢাকায় এই সংকট আরও তীব্র। তিনি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানি ও বৃষ্টির পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার নরগিস আক্তার, সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মার্টিনেজ ব্যাকস্ট্রো, ইউনিসেফের চিফ অব ওয়াশ পিটার ম্যাস ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেশীয় প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ।
নায়োকা মার্টিনেজ পানি খাতে সমাধান ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি রাজস্বভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করেন এবং সেখানে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। পিটার ম্যাস পানি ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি ড. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ স্বাস্থ্য খাতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান। তিনি উপস্থিত বক্তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ জানান।
