আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সিভিল সোসাইটি নেতা, মানবিক সহায়তা কর্মী এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বজ্রপাত থেকে মানুষের জীবন রক্ষায় জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা বলেন, বজ্রপাত বর্তমানে একটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে, যা প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানির কারণ হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের ঘটনা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের প্রস্তুতি এখনো অনেক কম এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচিতে বিষয়টি খুব কমই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে, গ্লোবাল সাউথের স্থানীয় ও জাতীয় মানবিক সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক এবং গ্র্যান্ড বার্গেইন স্বাক্ষরকারী অ্যালায়েন্স ফর এমপাওয়ারিং পার্টনারশিপ (এফোরইপি), বাংলাদেশের কোস্ট ফাউন্ডেশন, ভারতের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ), ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট অবজারভিং সিস্টেমস প্রমোশন কাউন্সিল (ক্রপ-সি) ও হিউম্যানিটারিয়ান এইড ইন্টারন্যাশনাল (এইচএআই)-এর যৌথ উদ্যোগে বৃহস্পতিবার ‘বজ্রপাতজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ঝুঁকিগুলোর মধ্যে বজ্রপাত একটি অন্যতম দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে, বাংলাদেশ ও নেপালে বজ্রপাতে মৃত্যুহার ও ঘটনার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ভারতেও বজ্রপাতের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বক্তারা বজ্রপাত মোকাবিলায় স্ট্যান্ডিং অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি), আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, কমিউনিটি-ভিত্তিক ঝুঁকি হ্রাস প্রটোকল, জনসচেতনতা, কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং সরকার-এনজিও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
ক্রপ-সি-এর চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) সঞ্জয় শ্রীবাস্তব ওয়েবিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, বজ্রপাতজনিত মৃত্যু কমাতে আগাম সতর্কতা ও কমিউনিটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বজ্রপাতের ঘটনাও বাড়ছে এবং তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে বজ্রপাতের ঘটনা ১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তিনি কমিউনিটি সচেতনতা বৃদ্ধি, বৃক্ষরোপণ, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, স্থানীয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, স্ট্যান্ডিং অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) এবং শক্তিশালী জলবায়ু অভিযোজন নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় বা নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পরামর্শ দেন এবং বজ্রপাত ঝুঁকি হ্রাসে কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সুধাংশু এস. সিং বলেন, প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি নেটওয়ার্কগুলোর মাঝে জ্ঞান বিনিময়, নীতিমালা প্রণয়ন এবং বজ্রপাত নিরাপত্তা প্রটোকল বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে শক্তিশালী সহযোগিতার আহ্বান জানান।
গওহর নঈম ওয়াহরা বাংলাদেশ সরকারের বজ্র নিরোধক স্থাপন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রশংসা করলেও বলেন, কার্যকর ঝুঁকি হ্রাসে কমিউনিটির অংশগ্রহণ এখনো সীমিত এবং তা আরও জোরদার করতে হবে।
রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের আটটি জেলায় একদিনে ১৪ জনের বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি মানুষের জীবন রক্ষায় সরকার, এনজিও ও কমিউনিটির সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
ইকবাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় বজ্রপাতে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। তিনি বজ্রপাত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত স্ট্যান্ডিং অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, নেপাল, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, ভারত, বাংলাদেশ ও চীন থেকে মোট ৭০ জন অংশগ্রহণকারী এই ওয়েবিনারে অংশ নেন। তারা বজ্রপাতের সময় করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর সাড়া ও চিকিৎসা প্রটোকল উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের মো. ইকবাল উদ্দিন ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানান এবং এইচএআই-এর জাহাবিয়া ডাক্তার ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন। কোস্ট ফাউন্ডেশনের মো. শাহিনুর ইসলাম আলোচনার সুপারিশসমূহ উপস্থাপন ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।