ফিলিস্তিনি নাকবার ৭৮তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে বিশ্বের নীরবতা যেন বিস্মৃতির এক গভীর বার্তা বহন করছে। জাতিসংঘে এ উপলক্ষে মাত্র আড়াই ঘণ্টার একটি সংক্ষিপ্ত ও এখনো অনিশ্চিত কর্মসূচি রাখা হয়েছে, যা চলমান এক বিপর্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। যে বিপর্যয় এখন গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুরো বিশ্ব গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা দেখছে, অথচ নাকবাকে দেখা হচ্ছে অতীতের একটি নিছক স্মৃতিচিহ্নের মতো।
যখন ইসরায়েলের হাসবারা (রাষ্ট্রীয় প্রচারণা) জোরদারে ৭৩ কোটি ডলারের বাজেট বাড়ানোর প্রয়োজন পড়েছে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নিজেদের ভূমিকা নিয়েও আত্মসমালোচনা করা। ইসরায়েল যখন নিজেদের ব্যাখ্যাকে টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বিশ্বনেতারা নাকবাকে গুরুত্বহীন করে তুলতেই ব্যস্ত। অন্যদিকে জাতিসংঘও একটি আনুষ্ঠানিক ও দায়সারা কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের দায় আড়াল করার চেষ্টা করছে।
ফিলিস্তিনিরা বারবার বলে আসছেন, নাকবা কোনো অতীত ঘটনা নয়, এখনো চলমান। কিন্তু জাতিসংঘ নাকবাকে এককালীন ঘটনা হিসেবেই দেখে। আর বিশ্বনেতারা এ বিষয়ে নীরব।
১৯৪৭ সালের বিভাজন পরিকল্পনার অবৈধতা, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ধ্বংস, ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ মতাদর্শ—যা জায়নবাদকে নাকবার ভিত্তি গড়ে দেয়।
যে ফিলিস্তিনিরা বিপর্যয়ের শুরুতেই নিজেদের ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, আজ তারা আরও বেশি বিচ্ছিন্ন—চিরস্থায়ী শরণার্থী হয়ে গণহত্যার মুখোমুখি।
১৯৪৭ সালে বিভাজন পরিকল্পনা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জায়নবাদী গোষ্ঠীগুলোর চালানো হত্যাযজ্ঞের বিরোধিতা করেনি বিশ্ব।
৭৮ বছর পরও ইসরায়েলের সহিংসতা কিংবা গাজায় তাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আপত্তি নেই। অধিকৃত পশ্চিম তীর আজও ভুয়া রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মাঝখানে আটকে আছে। আর ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের কথা খুব কমই বলা হয়।
এটিও পরিকল্পিত—যেমন ১৯৪৭ সালের বিভাজন পরিকল্পনাও ছিল একটি সহিংস উপনিবেশিক প্রকল্পের পথ তৈরি করার অংশ।
ফিলিস্তিনিরা যখন নাকবা স্মরণ করছে, তখন অন্তত তাদের এই স্মৃতিচারণকে সম্মান জানানো বিশ্বের দায়িত্ব। ফিলিস্তিনিদের সামষ্টিক স্মৃতি এবং বর্তমান বাস্তবতার মাঝখানে যে কয়েক দশকের ইতিহাস মানবিক সংকটের ভাষ্য ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা বয়ানের নিচে চাপা পড়ে আছে, তা বিশ্বচেতনায় পুনরায় উঠে আসার সুযোগ দিতে হবে।
যেভাবে বিশ্বের মানুষ ইসরায়েলের গণহত্যাকে ন্যায্যতা দেওয়ার যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে, একইভাবে নাকবা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানও প্রত্যাখ্যান করা উচিত।
নাকবা স্মরণে জাতিসংঘের দিকে তাকিয়ে থাকার কোনো মানে নেই, কারণ উপনিবেশবাদের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার ইতিহাস নথিভুক্ত। একইভাবে আন্তর্জাতিক আইনকেও নিরপেক্ষ মনে করার সুযোগ নেই, যখন তা সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর হাতে ইসরায়েলকে দায়মুক্তি দেওয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক
লেখাটি সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত