নিশুতি রাত। পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে। দূরে কোথাও কুকুর ডেকে ওঠে। ফ্রিজের ভেতর থেকে ভেসে আসে মৃদু শব্দ। দেয়ালঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে সময় সরিয়ে নিচ্ছে। অথচ একটি ঘরে এখনো জেগে আছেন একজন। মা। সন্তানের জ্বর কমেছে কি না, তিনি বারবার হাত রেখে বুঝতে চাইছেন কপালে। ডাক্তার বলেছে ভয় নেই। তবু মায়েরা রিপোর্টের চেয়ে নিঃশ্বাসের শব্দ বেশি বিশ্বাস করেন। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো আতঙ্কের নাম হয়তো সন্তানের অসুখ। আর সবচেয়ে পুরোনো শান্তি, মায়ের হাতখানি।
‘মা’ শব্দটি মানুষ খুব ছোটবেলায় শেখে। কিন্তু এই শব্দের গভীরতা বুঝতে বুঝতে অনেকের জীবন কেটে যায়। মানুষ পৃথিবীতে আসার আগেই একজন নারী নিজের শরীরের ভেতরে একটি ভবিষ্যৎ বহন করতে শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে বদলে যায় তার ঘুম, হাঁটার ভঙ্গি, খাবারের পছন্দ, শরীর, সময়, এমনকি পুরো জীবনও।
একটি শিশুর জন্ম সবাই দেখতে পায়। কিন্তু একজন মায়ের জন্ম হয় খুব নিঃশব্দে। সন্তান হাঁটতে শেখার আগে একজন মা শতবার পড়ে যাওয়া ঠেকান। সন্তান কথা বলতে শেখার আগেই তিনি কান্নার শব্দ শুনে আলাদা করতে পারেন, কোনটা ক্ষুধা, কোনটা ভয়, আর কোনটা শুধু কোলে উঠতে চাওয়া। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ভাষাও মানুষ একসময় শিখে ফেলে, কিন্তু কষ্ট পেলে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে সেই এক শব্দেই, মা।
ইতিহাসে যুদ্ধের তারিখ লেখা আছে। সাম্রাজ্যের নাম লেখা আছে। বিজয়ীদের নামও টিকে আছে ইতিহাসের পাতায়। শুধু লেখা নেই, কত মা রাত জেগে দরজার শব্দ শুনেছেন, কত মা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ভাত ঢেকে রেখেছেন ফিরে না-আসা সন্তানের জন্য। ইতিহাস বড় বড় মানুষের কথা মনে রাখে, কিন্তু ঘরের ভেতর নীরবে অপেক্ষা করে থাকা মায়েদের গল্পগুলো প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়।
সভ্যতা অনেক দূর এগিয়েছে। মানুষ সমুদ্রের নিচে শহর বানানোর কথা ভাবছে, মহাকাশে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখছে। তবু পৃথিবীর প্রায় সব মায়ের প্রথম প্রশ্ন এখনো একই, ‘খেয়েছিস?’
এই একটি প্রশ্নের ভেতরে লুকিয়ে আছে মানবসভ্যতার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মমতা। হয়তো সে কারণেই হাজার বছর আগেও মানুষ মাতৃত্বকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। প্রাচীন গ্রিসে দেবতাদের জননী ‘রিয়া’-কে ঘিরে পালিত হতো মাতৃত্বের উৎসব। ইংল্যান্ডে ছিল ‘মাদারিং সানডে’। আর আধুনিক মা দিবসের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন আনা জারভিস। ১৯০৮ সালের ১০ মে নিজের মায়ের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে তিনি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করেন মা দিবস। পরে ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে সরকারিভাবে “মাদার্স ডে” ঘোষণা করেন। এরপর দিনটি ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর দেশে দেশে।
কিন্তু মায়ের জন্য একটি দিন কি সত্যিই যথেষ্ট?
যে মানুষটি নিজের নতুন শাড়ির দাম শুনে চুপ করে যান, কারণ সামনে সন্তানের কোচিং ফি দিতে হবে, তার ভালোবাসা কি কোনো বিশেষ দিনের ভেতরে মাপা যায়? যিনি পুরোনো চশমার আঁচড় মুছতে মুছতে বলেন, “এখনো ভালোই দেখি”, তিনি আসলে নিজের প্রয়োজনটুকু সরিয়ে রাখেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। যিনি রাত জেগে অপেক্ষা করেন, অথচ দরজা খুলেই শুধু বলেন, ‘এলি?’
মায়ের অভিমানও ভালোবাসার আরেক রূপ।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, মা দিবসে পৃথিবীর অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি ফোন কল করা হয়। হয়তো মানুষ সেদিন হঠাৎ মনে করে, পৃথিবীতে এখনো একজন মানুষ আছেন, যিনি অভিমান করলেও অপেক্ষা করেন।
আমরা বড় হতে হতে অনেক কিছু বদলে ফেলি। বন্ধু বদলাই। শহর বদলাই। স্বপ্ন বদলাই। কখনো কখনো নিজের ভেতরের মানুষটাকেও হারিয়ে ফেলি। শুধু একজন মানুষ আমাদের পুরোনো নামেই ডাকেন, মা।
যাদের মা বেঁচে আছেন, তারা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, তাদের মাথার ওপর এখনো একটি অদৃশ্য ছাদ টিকে আছে। আর যাদের মা নেই, তারা জানেন, হঠাৎ একদিন পৃথিবীর শব্দ বদলে যায়। বাড়ি একই থাকে, দরজাও একই থাকে, শুধু ভেতরের নীরবতাটা অন্যরকম হয়ে যায়। মা মারা যাওয়ার পর মানুষ শুধু একজন মানুষকে হারায় না; সে হারায় সেই মানুষটিকে, যে খবর না দিলেও কণ্ঠের ভেতর ক্লান্তি চিনে ফেলত সবসময়।
মা মানে অসুখের রাতে কপালে ভেজা কাপড়। মা মানে শেষ মাছের টুকরোটা সন্তানের প্লেটে তুলে দেওয়া। মা মানে পুরোনো আলমারির ভেতর এখনো যত্ন করে রেখে দেওয়া ছোটবেলার জামা।
মা মানে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
সময় পৃথিবীর প্রায় সবকিছু বদলে দেয়। নদীর পথ বদলায়। শহরের নাম বদলায়। মানুষের মুখ বদলায়। শুধু বদলায় না একজন মায়ের অপেক্ষা। কারণ পৃথিবীর একমাত্র মানুষ মা, যিনি সন্তানের জন্মের আগেই তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন। আর সন্তানের বয়স যতই হোক, তার জন্য দরজাটা একটু খোলাই রাখেন, সবসময়।
লেখক: কবি, কথা-সাহিত্যি