তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের ক্ষমতায় আসার এক মাস পূর্ণ হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তীকাঈন সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তাতে এখন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে। দিল্লি তখন ওই সরকারকে কার্যত একটি ‘অনির্বাচিত’ সরকার হিসেবে বিবেচনা করে এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের ওপর জোর দেয়। ফলে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও সফর স্থগিত থাকে, এমনকি কিছু বাণিজ্যিক বিধি-নিষেধও আরোপ করা হয়।
তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ফল ঘোষণার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির নেতা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং পরে টেলিফোনে তার সঙ্গে কথাও বলেন। এতে বোঝা যায়, নয়াদিল্লি আবার ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী।
তবে নতুন করে শুরু হওয়া এই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কতটা স্থিতিশীল হবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের ওপর। এমন পাঁচটি সূচক বা লক্ষণই তুলে ধরা হয়েছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে।
ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে কি
এক সময় ভারতে বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ছিল বাংলাদেশের নাগরিকরা। কোভিডের আগের বছরেও প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসা, পর্যটন বা ব্যবসার কারণে ভারতে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ভারত বাংলাদেশে তাদের ভিসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দেয়। গত দেড় বছরে কেবল সীমিত মেডিকেল ও জরুরি ভিসা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ভারতীয় কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে ভিসা কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক করা হতে পারে। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সম্পর্ক উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।
প্রথম বিদেশ সফর কোথায় করবেন তারেক রহমান
কোনো নতুন সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর সাধারণত তার কূটনৈতিক অগ্রাধিকার সম্পর্কে ধারণা দেয়। তারেক রহমান যদি প্রথম সফরে দিল্লি যান, তাহলে বোঝা যাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে শক্তিশালী করার চেষ্টা হচ্ছে।
অন্যদিকে তিনি সৌদি আরব, চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশে সফর করলেও তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হবে। আবার এমনও হতে পারে যে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেই আমন্ত্রণ জানালেন। মোদি যদি ঢাকায় নতুন সরকারের প্রথম অতিথি হন, সেটাও কম তাৎপর্যপূর্ণ হবে না।
ভারতের ক্রিকেট দল কি বাংলাদেশ সফরে যাবে
২০২৫ সালের আগস্টে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে ভারতের বাংলাদেশ সফরের কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এর পেছনে রাজনৈতিক কারণও ছিল। সফরটি পরে পুনঃনির্ধারণের কথা বলা হলেও তা এখনো নিশ্চিত নয়। নতুন সরকারের সময় ভারত যদি সেই সফর বাস্তবায়ন করে, তাহলে সেটিও সম্পর্ক উন্নতির একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হবে।
কানেক্টিভিটি ও অন্যান্য সহযোগিতা
দেড় বছরের বেশি সময় ধরে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন ও অনেক পরিবহন সংযোগ বন্ধ রয়েছে। কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেন পরিষেবা বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি আগরতলা-আখাউড়া রেল সংযোগ প্রকল্পও থমকে আছে। এই প্রকল্পটি চালু হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে।
দুই দেশের সম্পর্কে ‘কানেক্টিভিটি’কে সব সময়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে ভারত। এই সংযোগ নানা কারণে তাদের খুব প্রয়োজন হওয়ায় বিপুল বিনিয়োগও করেছে তারা।
নতুন সরকারের সময়ে এসব সংযোগ প্রকল্প আবার এগোলে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক বার্তা দেবে।
গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের প্রশ্ন
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে। চুক্তিটি নবায়ন করতে হলে দুই দেশের রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন, যা এখনো শুরু হয়নি। সময়মতো আলোচনা শুরু হলে তা সম্পর্কের নতুন গতি সৃষ্টির ইঙ্গিত দেবে।
সব মিলিয়ে, বিএনপি সরকারের প্রথম মাসেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক সংকেত দেখা যাচ্ছে। তবে ভিসা, সংযোগ প্রকল্প ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে।