তার পুরো নাম খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। ২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় তার নাম ছিল ২ নম্বরে। তিনি মূলত ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রক ছিলেন। দীর্ঘ ২০ বছর কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান।
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রায় দুই দশক পর আবারও ফিরে এসেছে সেই পুরোনো আতঙ্ক। গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারামুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ঘিরে যখন জনমনে উদ্বেগ তুঙ্গে, ঠিক তখনই গতকাল মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) নিউমার্কেট এলাকায় চিরচেনা স্টাইলে খুন হলেন কুখ্যাত কিলার খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। এই হত্যাকাণ্ডের পর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই আলোচিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা নিয়ে আবারও চায়ের টেবিল থেকে নিউজ ডেস্ক পর্যন্ত শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার ঢাকাসহ সারা দেশের অপরাধ জগতকে স্তব্ধ করে দিতে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল ২৩ জন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর একটি বিশেষ তালিকা। সেই সময় অপরাধীরা এতটাই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল যে, থানা-পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল রাজধানীর রমনা, নিউমার্কেট, মিরপুর ও ধানমন্ডি এলাকা।
তালিকায় থাকা অপরাধীদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারিভাবে প্রথমবারের মতো বড় অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের সেই ঘোষণা তৎকালীন সংবাদপত্রে মূল শিরোনাম হয়ে উঠেছিল। এই তালিকার মূল উদ্দেশ্য ছিল অপরাধীদের সামাজিকভাবে কোণঠাসা করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরাসরি অ্যাকশনে যাওয়ার আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া। এই তালিকা প্রকাশের পরই মূলত আন্ডারওয়ার্ল্ডে শুরু হয় চরম ভাঙন; কেউ বিদেশে পাড়ি জমান, কেউবা পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান।
গতকাল নিউমার্কেটের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের কাছে গুলিতে নিহত খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন ছিলেন সেই ২৩ জনের তালিকার ২ নম্বর সিরিয়ালে থাকা সন্ত্রাসী। তার মৃত্যুর পর পাঠক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বাকি ২২ জন এখন কোথায়?
শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর বর্তমান অবস্থা ও তাদের গ্রেপ্তারে পুরস্কারের বিবরণ
১. প্রকাশ বিশ্বাস (পুরস্কার: ১ লাখ টাকা) বর্তমানে ইউরোপে (সম্ভবত ফ্রান্সে) অবস্থান করছেন বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
২. খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) নিহত। ২০ বছর জেল খেটে গত আগস্টে মুক্তি পান এবং গতকাল ২৮ এপ্রিল রাতে নিউমার্কেটে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান।
৩. তানভীরুল ইসলাম জয় (পুরস্কার: ১ লাখ টাকা) বর্তমানে দুবাই বা মালয়েশিয়ায় পলাতক বলে ধারণা করা হয়।
৪. সানজিদুল ইসলাম ইমন (পুরস্কার: ১ লাখ টাকা) কারাগারে। তিনি নিহত টিটনের বোন জামাই। ভারতে গ্রেপ্তারের পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
৫. সুব্রত বাইন (পুরস্কার: ১ লাখ টাকা) ভারতে দীর্ঘ জেল খাটার পর সম্প্রতি কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় তাকে ডিবি আটক করেছে।
৬. মোল্লা মাসুদ (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) দীর্ঘদিন ভারতে পলাতক ছিলেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি আছে।
৭. কিলার আব্বাস (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) কারাগারে। কাশিমপুর কারাগারে থেকেও তার বিরুদ্ধে মিরপুর এলাকার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।
৮. খন্দকার তানভীর ইসলাম জয় (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়।
৯. লিটন ওরফে ছোট লিটন (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) ভারতের কারাগারে দীর্ঘদিন থাকার পর বর্তমানে তার অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
১০. পিচ্চি হান্নান (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) নিহত। ২০০৪ সালে র্যাবের সঙ্গে এক বন্দুকযুদ্ধে তিনি মারা যান।
১১. কিলার আরমান (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) কারাগারে। সম্প্রতি তার পক্ষ থেকে জামিনে মুক্তির চেষ্টা চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
১২. কালা জাহাঙ্গীর (পুরস্কার: ১ লাখ টাকা) নিখোঁজ। প্রায় দুই দশক ধরে তার কোনো হদিস নেই। ধারণা করা হয় তিনি মারা গেছেন।
১৩. সৈয়দ নাজমুল মুরাদ (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
১৪. লিয়াকত হোসেন (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) দীর্ঘদিন নিখোঁজ। ধারণা করা হয় ভারতে থাকাকালে তিনি মারা গেছেন।
১৫. আবদুল রশিদ ওরফে টিটন (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) দীর্ঘদিন ধরে পলাতক। তার বর্তমান অবস্থান অজানা।
১৬. টিটো ওরফে পিচ্চি টিটো (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) পলাতক। তার সম্ভাব্য অবস্থান ভারত বা নেপাল হতে পারে।
১৭. জিসান (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই ঢাকার চাঁদাবাজি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমন্বয় করেন বলে অভিযোগ আছে।
১৮. আলাউদ্দিন (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) নিহত। অনেক আগেই পুলিশের সাথে এক এনকাউন্টারে তিনি মারা যান।
১৯. ফ্রিডম সোহেল (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) কারাগারে। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি কারাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।
২০. খোরশেদ আলম রাসু (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) গত আগস্টে বিশেষ প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্ত হওয়ার পর বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন।
২১. আগা শামীম (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) বর্তমানে ভারতে আত্মগোপনে আছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে।
২২. মশিউর রহমান কচি (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) কারাগারে। সম্প্রতি তিনি আদালতের কাছে জামিনের আবেদন করেছিলেন।
২৩. জাফর আহমেদ মানিক (পুরস্কার: ৫০ হাজার টাকা) বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। সেখানে তিনি স্থায়ী নাগরিকত্ব পেয়েছেন বলে গুঞ্জন আছে।
টিটন ২০ বছর কারাবাসের পর গত আগস্টে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন। তার এই মুক্তি ছিল সরকারের তালিকাভুক্ত ১১ শীর্ষ সন্ত্রাসীর বিশেষ প্রক্রিয়ায় কারাগার থেকে বের হওয়ারই একটি অংশ। কিন্তু মুক্তির মাস কয়েকের মাথায় টিটন যেভাবে খুন হলেন, তাতে পরিষ্কার যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই পুরোনো অন্তর্ঘাতী সংঘাত আবারও প্রাণ পেয়েছে। বিশেষ করে টিটনের আপন বোন জামাইও তালিকার ৪ নম্বর শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন (ক্যাপ্টেন ইমন) এই খুনের নেপথ্যে রয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠায় জনমনে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
পাঠক ও বিশ্লেষকদের মতে, টিটনের এই খুন শুধু একজন সন্ত্রাসীর মৃত্যু নয়, বরং এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কারাগার থেকে বের হওয়া বা বিদেশে থাকা বাকি সন্ত্রাসীরাও এখন একে অপরের টার্গেটে পরিণত হতে পারে। ২৩ জনের সেই পুরোনো তালিকাটি তাই আবারও ফিরে এসেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর টেবিলের একদম ওপরে। দীর্ঘ দুই দশক পর আবারও সেই শীর্ষ সন্ত্রাসী তকমাটি ঢাকার অপরাধ মানচিত্রে এক নতুন ও রক্তাক্ত অধ্যায় শুরু করল।
টিটন নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অপরাধ জগতে পা রাখেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও অস্ত্র মামলা ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা মামলা, যেটিতে ২০১৪ সালে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। টিটন কেবল খুনিই ছিলেন না, তার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী অস্ত্রের নেটওয়ার্কও ছিল।
টিটনের জন্ম ১৯৬৬ সালে। তার বাবার নাম কে এম ফখরুদ্দিন এবং মায়ের নাম আকলিমা বেগম। তার পারিবারিক অপরাধ বলয় ছিল বেশ শক্তিশালী; তার বোন শাহনাজ পারভীন লিনাকে বিয়ে করেছিলেন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন (ক্যাপ্টেন ইমন)।
কারাগার থেকে মুক্তির পর টিটন বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি তার ভগ্নিপতি ক্যাপ্টেন ইমনের টার্গেটে আছেন। তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এনআইডি না থাকায় পাসপোর্ট করতে পারেননি। ফলে তিনি অত্যন্ত গোপনে নিউমার্কেট ও মোহাম্মদপুর এলাকায় আত্মগোপন করে ছিলেন। ঘটনার রাতে তিনি নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় অবস্থান করছিলেন, সেখানেই মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী হিসেবে তার দুলাভাই বা ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের (ক্যাপ্টেন ইমন) নাম উঠে এসেছে। তাদের সম্পর্ক ছিল চরম শত্রুতাপূর্ণ। এর প্রধান কারণ টিটনের আপন ভাই টুটুলকে ইতিপূর্বে 'ক্রসফায়ারে' হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পেছনে মূল কারিগর ছিলেন ক্যাপ্টেন ইমন।
ইমন মনে করতেন টিটন বেঁচে থাকলে তার একক আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, ইমনের নির্দেশনায় তার বিশ্বস্ত সহযোগী তপন সানির নেতৃত্বে এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে।