ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাসে সীমান্ত বরাবরই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কখনো অনুপ্রবেশ, কখনো সীমান্ত হত্যা, কখনো চোরাচালান, দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে সীমান্ত নিরাপত্তা। এবার সেই পুরোনো ইস্যুই নতুন করে আলোচনায় এসেছে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর গত শনিবার সরকার গঠন করে বিজেপি। আর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় গত সোমবার (১১ মে) অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে অগ্রাধিকারমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে সামনে আনা হয়। বৈঠক শেষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
এই ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা ও তীব্র প্রতিক্রিয়া। কেউ এটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, এটি নিছক নিরাপত্তা নয়, বরং বাংলাদেশকে উদ্দেশ্য করে বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক একটি বার্তা।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য চার হাজার ৯৬ কিলোমিটারের বেশি। এর মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে দুই হাজার ২১৬ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরেই এই সীমান্তের বড় অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ চলছে। তবে এখনো প্রায় ৫৬৩ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নির্মাণ শেষ হয়নি।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এর আগেই অভিযোগ করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের সময় সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি বিএসএফকে দেওয়া হয়নি।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিজেপি বলেছিল, ক্ষমতায় এলে দ্রুত সেই জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সরকার গঠনের পর প্রথম সিদ্ধান্তগুলোর একটি হিসেবে সীমান্তের বিষয়টি সামনে আনা সেই প্রতিশ্রুতিরই বাস্তব রূপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশে বিষয়টি কেবল অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কারণ, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক আগের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সীমান্তে উত্তেজনা, গুলি, বাংলাদেশিদের মৃত্যু এবং ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে যে বক্তব্য বাড়ছিল, সেটিও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না এলেও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির স্পষ্ট ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন ভয় দেখানোর জায়গা নেই।’
তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতারকে ভয় পায় না এবং সীমান্তে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে সীমান্তে গুলি করে মানুষ হত্যা কিংবা মরদেহ ঝুলিয়ে রাখার যে অভিযোগ উঠেছিল, সেই ধরনের পরিস্থিতি আর মেনে নেওয়া হবে না বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে, বর্তমান বাংলাদেশ নিজেকে আগের তুলনায় ভিন্ন অবস্থানে দেখতে চায়। ‘এই বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশ না যে বসে বসে দেখবে’, এই মন্তব্য কূটনৈতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজস্ব বিষয়। তবে সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিজিবি সতর্ক রয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়ায়ও দেখা গেছে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
জামায়াতে ইসলামী বলছে, ভারত যদি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বেড়া নির্মাণ করে, সেটি তাদের অধিকার। কিন্তু যদি এই উদ্যোগ বাংলাদেশের মর্যাদাহানি বা সীমান্তে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হয়, তাহলে সেটি উদ্বেগজনক।
দলটির নেতা হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, অন্য রাষ্ট্রকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে কাঁটাতারের ব্যবহার হলে তা হবে বিপজ্জনক প্রবণতা। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছেন বলেও জানান।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনে করছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে নিরাপত্তার চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বেশি। দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বহু পুরোনো। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো বহুবার উদ্বেগ জানালেও ভারত তাতে গুরুত্ব দেয়নি। তার ভাষায়, ‘কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে তারা বিভেদের দেওয়াল তুলছে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বিশেষ করে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই ‘অনুপ্রবেশ’ ও ‘সীমান্ত নিরাপত্তা’কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে এসেছে। ফলে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই সীমান্ত ইস্যুকে সামনে আনা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে।
ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও বলছেন, সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে জমি অধিগ্রহণ। বহু সীমান্তবর্তী গ্রাম, নদী, জলাভূমি ও পাহাড়ি এলাকা থাকায় পুরো সীমান্তে একই ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা সহজ নয়।
বিএসএফের সাবেক মহাপরিচালক পি কে মিশ্রও বলেছেন, স্থানীয় মানুষের জমি অধিগ্রহণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, এত বছর ধরে কাঁটাতারের বিশাল অংশ তৈরি থাকার পরও অনুপ্রবেশ, চোরাচালান কিংবা সীমান্ত অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি কেন?
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের মতে, সীমান্ত সমস্যা কেবল কাঁটাতার দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক আস্থা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে একদিকে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তে কাঁটাতার, অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে আবারও বাড়ছে উত্তেজনা। ফলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্ত সীমান্তের মাটির বেড়ার চেয়েও বড় এক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।