শিশু নিপীড়ণ, ধর্ষণ ও বিচারহীনতা
‘আর না শিশু নিপীড়ণ, ধর্ষণ, বিচারহীনতা’ কর্মসূচি থেকে ঘোষিত পাঁচ দফা দাবির প্রতি সংহতি জানিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম চার নেতা। রোববার (২৪ মে) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর বিচারব্যবস্থা, পুলিশি জবাবদিহিতা ও ভুক্তভোগী সহায়তা জোরদারের দাবি জানানো হয়।
কর্মসূচি থেকে উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে সব ধর্ষণ মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা, কোনো ধরনের সালিশ বা আপসের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি বন্ধ করা ও মামলার অগ্রগতি ডিজিটাল ডেটাবেজে প্রকাশ করা। এ ছাড়া প্রশিক্ষিত নারী পুলিশ ইউনিট, ২৪ ঘণ্টার জাতীয় হটলাইন ও দ্রুত জরুরি সাড়া নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়। স্কুল, কলেজ, মাদরাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ভালো স্পর্শ-খারাপ স্পর্শ’ বিষয়ে সচেতনতা, আত্মরক্ষা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা শিক্ষা চালুর আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ ও অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল গঠনের দাবি তোলা হয়। জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারকে আরও কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ করার কথাও বলা হয়।
এনপিএ নেতা অনিক রায় বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় ‘পপুলিস্ট বক্তব্য’ ও ‘স্লোগাননির্ভর বিচার’ নয়, কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালকে দ্রুত কার্যকর করতে হবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদা হটলাইন চালু করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা তাৎক্ষণিক সহায়তা পান। শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এ ধরনের সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধ সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিকুর সালেহীন বলেন, নারী নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশিক্ষিত নারী পুলিশ ইউনিট ও ২৪ ঘণ্টার জরুরি হটলাইন জরুরি। অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানানো বা আপসের চাপ প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা ও আত্মরক্ষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সংগঠনে কার্যকর যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠন করতে হবে।
গণবিপ্লব উদ্যোগের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীদের জড়বস্তু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান এবং অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত সাইবার বুলিং উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তিনি অভিযোগ করেন, নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল এবং হাসপাতালভিত্তিক ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। বিভিন্ন উদ্যোগের ঘোষণা এলেও বাস্তবে ভুক্তভোগীরা কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাচ্ছেন না।
তিনি আরও বলেন, নারীদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং ও অবজেক্টিফিকেশন বন্ধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট, দ্রুত সাড়া দেওয়ার হেল্পলাইন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠনের দাবি জানান তিনি। ধর্ষণ মামলার বিচার এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে বিশেষ বিচারিক রিভিউ বোর্ডের মাধ্যমে কারণ পর্যালোচনা করতে হবে। ফরেনসিক রিপোর্টে বিলম্ব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব ও ঢাকা-১২ আসনের পরাজিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা বলেন, বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য আইনগত সময়সীমা থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রয়োগ নেই। তার মতে, যে আইনের প্রয়োগ নেই, সেই আইন থাকা আর না থাকা একই কথা।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন করলেই হবে না, আইন বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তার সংখ্যা, প্রশিক্ষণ, ফরেনসিক ল্যাবের সক্ষমতা ও ঢাকার বাইরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ডা. তাসনিম জারা বলেন, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত জনবল ও প্রশিক্ষণ আছে কিনা, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে এবং এই দায় সরকারকে নিতে হবে। একই সঙ্গে সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে জরুরি সাড়ার ব্যবস্থার দাবি জানান তিনি।
কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য কার্যকর আইন প্রয়োগ, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে জরুরি বলে তারা মত দেন।