জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভারতবিরোধী ও পরবর্তী সময় হাসিনা সরকারের পতনের পর গত এক বছর জামায়াত যে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে এসেছে, এখন সেই সুর অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভারত প্রশ্নে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভারতবিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত জামায়াত ভারতের বিষয়ে তাদের আগের কঠোর ভাষা থেকে সরে এসে তুলনামূলক সংযত ও নমনীয় অবস্থান নিচ্ছে–এমন আলোচনা আছে বিভিন্ন মহলে। দলটির সাম্প্রতিক বক্তব্য ও নির্বাচনী ইশতেহার ঘিরে এই আলোচনার পালে আরও হাওয়া দিয়েছে।
নির্বাচন উপলক্ষে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে ওই ইশতেহার তুলে ধরেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারের ভাষায় পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যেও ভারতের প্রতি আগের তুলনায় সংযত সুর লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে।
গত মাসে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে ‘গোপন বৈঠকের’ অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে (১ জানুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে ব্যাখ্যা দেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
পোস্টে তিনি লিখেন, অসুস্থতার পর বাসায় ফেরার সময় দেশ-বিদেশের অনেক কূটনীতিক তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যান্য দেশের কূটনীতিকদের মতো ভারতের দুজন কূটনীতিকও সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তবে এ সাক্ষাৎকে গোপন বৈঠক হিসেবে উপস্থাপন করায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং এ ধরনের সংবাদকে বিভ্রান্তিকর বলে তীব্র নিন্দা জানান।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো বৈঠক হলে তা প্রকাশ্যেই হবে এবং এতে গোপনীয়তার কিছু থাকবে না।
নানা সমীকরণ বিবেচনা করে অনেকে বলছেন, ২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভারতবিরোধী ও পরবর্তী সময় হাসিনা সরকারের পতনের পর গত এক বছর জামায়াতে ইসলামী যে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে এসেছে এখন সেই সুর অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে। এতে করে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে সত্যিই কি জামায়াতে ইসলামী ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসছে, নাকি এটি কেবল নির্বাচনী বাস্তবতায় জয়লাভের ভাষাগত ও কৌশলগত পরিবর্তন? বিষয়টি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে কৌতুহল শুরু হয়েছে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই ভারতের ভূমিকা নিয়ে জামায়াত সংশয় প্রকাশ করে এসেছে। সে সময় জামায়াত পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর অখণ্ডতা রক্ষাকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল এবং ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা ভারতের নিজেদের স্বার্থে বলে মনে করতো। এই দৃষ্টিভঙ্গিই মুক্তিযুদ্ধ ও ভারতের ভূমিকা নিয়ে তাদের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ভিত্তি তৈরি করে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন ও পরবর্তী সময়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে জামায়াত ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন তুলে এসেছে। তাদের বক্তব্যে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ, আঞ্চলিক আধিপত্যের আশঙ্কা এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাস রচনাতেও ভারতের ভূমিকা অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে–এমন অভিযোগ জামায়াতের বিভিন্ন নেতা বিভিন্ন সময়ে করেছেন। ফলে ভারতের বিরোধিতা কেবল সাম্প্রতিক রাজনীতির বিষয় নয়; বরং এটি জামায়াতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের অংশ।
এই আদর্শিক ধারার প্রতিফলন দেখা যায় কয়েক মাস আগের বক্তব্যেও। গত বছরের মার্চে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে এবং এ বিষয়ে তাদের গণমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যে ভিন্ন সুরও শোনা যাচ্ছে। বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতে।কিছুদিন আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত কখনোই ভারতবিরোধী রাজনীতি করেনি। তিনি দাবি করেন, দলটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করতে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হয়েছে। কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব–এটাই জামায়াতের আন্তর্জাতিক নীতি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে গত রবিবার (০৮ ফেব্রুয়ারি) দলটির নীতিগত অবস্থান জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সিনিয়র প্রচার সহকারী মুজিবুল আলম ফোনে নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, এ বিষয়ে দলের আমির যে বক্তব্য দিয়েছেন; সেগুলো ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর অবস্থান থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমুচিত হবে না বলেও তিনি জানান। তবে বিস্তারিত জানতে নায়েবে আমির ও কুমিল্লা–১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনের প্রার্থী ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
নাগরিক প্রতিদিনের প্রতিবেদক রোববার সারাদিন একাধিকবার ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে এসময় তার হোয়াইসঅ্যাপে এ বিষয়ে প্রশ্ন লিখে পাঠালে তিনি দেখেও কোন সাড়া দেননি।
একই দিন সন্ধ্যায় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা হামিদুর রহমান আযাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সভায় আছেন বলে জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে রাত ১০টার পর ফোন দিতে বলেন। তবে রাত ১১টায় পুনরায় ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করে প্রতিবেদকের পরিচয় শুনে কল কেটে দেন এবং পরবর্তীতে আর ফোন ধরেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান পুরোপুরি বদলে গেছে–এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। বরং সময় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে দলটি নীতিগত অবস্থান অপরিবর্তিত রেখে উপস্থাপনের ভাষা ও কৌশলে পরিবর্তন আনছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কে এম মহিউদ্দিন বলেন, সামনে নির্বাচন—এটি জামায়াতের জন্য একটি বড় বাস্তবতা। এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দলটির সামনে একাধিক হিসাব কাজ করছে। একদিকে রয়েছে ভাসমান ভোটার, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের একটি অংশ; অন্যদিকে নতুন ও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে গেলে তা নির্বাচনী ফলাফলে কী প্রভাব ফেলতে পারে—এই প্রশ্নও জামায়াতের বিবেচনায় রয়েছে। সে কারণেই দলটি একটি কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে বলে মনে হয়। নির্বাচনের পর দলটি কী করবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াতের এই অবস্থানকে স্পষ্টভাবেই একটি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা যায়।