তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে শনিবার ভোরে প্রথম আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গেই ইসরায়েলি এবং প্রবাসী ইরানিদের একাংশ উল্লাসে ফেটে পড়েন। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং সামরিক ও রাজনৈতিক শীর্ষ পর্যায়ের আরও বহু নেতা নিহত হন।
জেনেভা ও ওমানে চলমান আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিদল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছিল— এমনটাই জানিয়েছেন ওমানের প্রধান আলোচক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি। প্রস্তাব ছিল, ইরানের পুরো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইয়ের মাধ্যমে হ্রাস করা হবে, যাতে তা বোমা তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা না যায়।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের পথ বেছে নিলেন।
আমি মনে করি, এই আলোচনা শুরু থেকেই ছিল প্রহসন— যেমনটি গত জুনেও হয়েছিল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথমবার ইরানের ওপর হামলা চালায়।
সিআইএ মাসের পর মাস খামেনির গতিবিধি অনুসরণ করছিল। অভিযানটি অপেক্ষা করছিল সেই মুহূর্তের, যখন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একত্র হবে। শনিবার পাশাপাশি দুটি ভবনে বৈঠকের সময় সেই সুযোগ আসে এবং ইসরায়েল আঘাত হানে।
একই ভাষ্যে কথা বলার মতো করে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের রাস্তায় নেমে শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানান। জানুয়ারিতেও তারা এমন চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান প্রথম দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, তবে বিদ্রোহে নয়, শোক মিছিলে।
তেহরানের একবাতানের মতো কিছু এলাকায় মানুষ নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টের আড়াল থেকে উল্লাস করেছিল। কিন্তু অন্যত্র ছিল আর্তনাদ। আবার অনেকে কিছুই করেনি, তারা শুধু অপেক্ষা করছিল, সামনে কী আসে সেই আশঙ্কায়।
প্রথম মুহূর্ত থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, এই যুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নয়, এটি শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ।
অদ্ভুতভাবে, এই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর বিরুদ্ধেই ট্রাম্প এবং তার ‘মাগা’ আন্দোলন প্রচার চালিয়েছিল। ২০২৩ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডেরিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ‘ডিপ স্টেট’ ভেঙে দেবেন, যুদ্ধবাজদের হটাবেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে রিয়াদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, তথাকথিত ‘নেশন-বিল্ডাররা’ যতটা দেশ গড়েছে তার চেয়ে বেশি ধ্বংস করেছে।
এখন উপসাগরে বড় যুদ্ধ শুরু করার পর তিনি ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিক্ষোভকারীদের সহায়তা এবং শাসন পরিবর্তন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরও একটি কারণ যোগ করেছেন, হামলাটি নাকি ছিল ‘প্রতিরোধমূলক’। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েল হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এবং যদি তা হতো, যুক্তরাষ্ট্রই পাল্টা আঘাতের মূল ভার বহন করত। তাহলে কি রুবিও স্বীকার করলেন যে তার কমান্ডার-ইন-চিফকে ইসরায়েল কার্যত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে? ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন উল্টোটা, তিনিই নাকি ইসরায়েলকে চাপ দিয়েছেন।
যাই হোক, নেতানিয়াহু বরাবরই ইরানকে ‘আমালেক’ বলে অভিহিত করে চূড়ান্ত আঘাত হানার কথা বলেছেন। প্রায় ৪৭ বছর ধরে তিনি এই দিনের জন্য প্রার্থনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, বিরোধী রাজনীতিক হিসেবে বারবার তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও নিজের সামরিক বাহিনীকে এমন হামলায় রাজি করাতে চেয়েছেন। এটি জুনের মতো সীমিত সময়ের আঘাত নয়। এটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের সর্বাত্মক যুদ্ধ।
শনিবারের ভাষণে নেতানিয়াহু ইরানিদের জাতীয় পরিচয়ে নয়, জাতিগত পরিচয়ে সম্বোধন করেছেন—পার্সিয়ান, কুর্দি, আজারি, বালুচ, আহওয়াজি। এর মধ্যেই কৌশল স্পষ্ট।
বোমাবর্ষণও একই বার্তা দেয়। লক্ষ্যবস্তু ছিল সংস্কারপন্থী, বামপন্থী, সাবেক প্রেসিডেন্ট—সব ধারার রাজনৈতিক অভিজাতরা। নতুন কোনো বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষণ নেই। বরং ইরানকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে জাতিগত অঞ্চলে বিভক্ত করার ইঙ্গিত স্পষ্ট, যেমনটি ইসরায়েল সিরিয়ায় করার চেষ্টা করেছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করুন।’ কিন্তু ইরানের মানুষ দেখেছে তথাকথিত ‘মুক্ত বিশ্বের’ পাইলটরা একটি স্কুলে বোমা মেরে ১৮০ জনকে হত্যা করেছে, যাদের বেশিরভাগই ছিল কিশোর-কিশোরী। হাসপাতাল ও বড় শহরগুলোতেও হামলা হয়েছে।
চার দিনের মধ্যে ৭৫০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। গাজা, দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতে যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, ইরানেও সেই একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে।
ইরানকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ধ্বংস করাই এখন মূল লক্ষ্য। স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি তার অগ্রাধিকারের তালিকায় অনেক নিচে। কোনো যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা নেই। ইসলামী প্রজাতন্ত্র পতন হলে কে ক্ষমতায় আসবে, তার জনপ্রিয়তা কতটুকু, সে নিয়ে কোনো বাস্তব চিন্তা নেই।
এই পরিকল্পনা বৃহত্তর এক স্বপ্নের অংশ—‘গ্রেটার ইসরায়েল’। নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত বিস্তৃত এক ভূখণ্ডের স্বপ্ন বহুদিনের।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক নয়। ইসরায়েলের শক্তিশালী অ-পশ্চিমা মিত্র হিসেবে ভারতের উত্থান এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সম্পর্ক সেই কৌশলকে জোরদার করছে।
ইরান এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে। অতীতে যাদের মৌলবাদী ও বেপরোয়া বলা হতো, তারা বাস্তবে অনেক বেশি সতর্ক ছিল। কিন্তু তারা দেরিতে বুঝেছে যে, গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় যে সর্বাত্মক ধ্বংসযুদ্ধ চালানো হয়েছে, সেটি একদিন তাদের দরজায়ও কড়া নাড়বে।
৭ অক্টোবরের ঘটনার পর ইরান ও হিজবুল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলেনি, সেটিই ছিল মারাত্মক ভুল। তারা একে একে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এখন ইরান কৌশল বদলেছে। গত জুনের মতো শুধু ইসরায়েলের দিকে রকেট ছোড়া নয়, এবার মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্ররা।
২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে, দুবাইয়ে হামলা চালিয়েছে, সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল শোধনাগার ও দোহায় তরলীকৃত গ্যাস উৎপাদন ব্যাহত করেছে। তেল-গ্যাসের দাম বেড়েছে, জাহাজে আগুন, ফ্লাইট স্থগিত।
ইরান জানে, এই যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ট্রাম্প নিজেই দুর্বল হবেন। তার ‘মাগা’ সমর্থকরাই প্রশ্ন তুলবে— এই যুদ্ধের প্রয়োজন কী ছিল?
যদি ইরান ভেঙে পড়ে, তাহলে উপসাগরজুড়ে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দেবে। গৃহযুদ্ধ হলে লাখো মানুষ পশ্চিমে শরণার্থী হয়ে ছুটবে।
আর যদি ইরান টিকে থাকে, তাহলে সেটিই হবে তার বিজয়, কারণ এই যুদ্ধে দুর্বলতম কড়ি ট্রাম্প নিজেই।
ইসরায়েল এখন এমন এক দুর্বল প্রতিবেশী বলয় তৈরি করতে চাইছে, যার ভেতর দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুন করে আঁকা যাবে— এক নতুন সাইক্স-পিকো।
তারপর সময়ের অপেক্ষা মাত্র, কবে নেতানিয়াহু তুরস্ককেও পরবর্তী ‘আমালেক’ ঘোষণা করেন।
ডেভিড হার্স্ট
ব্রিটিশ সাংবাদিক, বিশ্লেষক এবং মিডল ইস্ট আইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক
লেখাটি মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত