রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, সেটি জাতীয় রাজনীতিই হোক কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটনীতিই হোক। সময়, স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে বহুদিনের সম্পর্কের সমীকরণ। ভারত-তুরস্ক সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতির দিকে তাকালে সেই পুরোনো সত্যটিই আবার সামনে আসে। কাশ্মীর ইস্যু, পাকিস্তান প্রশ্ন ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে দীর্ঘদিন দূরত্বে থাকা দিল্লি ও আঙ্কারা এখন ধীরে ধীরে আবার একে অপরের দিকে এগিয়ে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ডামাডোল, বৈশ্বিক শক্তির নতুন মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে দুই দেশই বুঝতে শুরু করেছে, পুরোনো শত্রুতা আঁকড়ে ধরে রাখলে লাভের চেয়ে ক্ষতির ঝুঁকিই বেশি।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও তুরস্কের সম্পর্ক ছিল অস্বস্তি, অবিশ্বাস আর রাজনৈতিক দূরত্বের সমীকরণে বন্দি। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের প্রকাশ্য পাকিস্তানপ্রীতি দিল্লির সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্কে বারবার উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুই দেশই হয়তো ধীরে ধীরে সম্পর্কের বরফ গলাতে চাইছে। অন্তত এক বছরের টানাপোড়েনের পর এখন দুই পক্ষই নতুন করে কাছে আসার জন্য পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
গত কয়েক বছরে ভারতের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তান প্রশ্ন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান একাধিকবার কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করেন। জাতিসংঘের মঞ্চেও তিনি কাশ্মীর নিয়ে মন্তব্য করেছেন, যা ভারত প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে। এর জবাবে দিল্লিও ধীরে ধীরে তুরস্কের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়াতে শুরু করে।
দুই দেশের সম্পর্কের এই অবনতি শুধু কূটনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতীয় জনমতেও তুরস্কবিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় পাকিস্তানের প্রতি তুরস্কের সমর্থন ভারতে নতুন ক্ষোভ তৈরি করে। ভারতীয় গণমাধ্যমে তুরস্ককে ‘পাকিস্তানের দোসর’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তুরস্ক বয়কট’ ট্রেন্ডও দেখা যায়। ভারতীয় কিছু ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম তুরস্ক ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তুর্কি পণ্য বর্জনের ডাক দেয়।
এই উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় আসে ভারত-তুরস্ক সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর দুই দেশের পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের বৈঠক আবার শুরু হয়েছে। দিল্লি ও আঙ্কারা এখন বুঝতে পারছে, কেবল পাকিস্তান ইস্যু ঘিরে সম্পর্ক আটকে রাখলে উভয় দেশই কৌশলগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে বড় কারণ অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতি। ভারত এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি। অন্যদিকে তুরস্কও মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়। ফলে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, পর্যটন ও প্রযুক্তিখাতের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে।
তবে এই সম্পর্কের সবচেয়ে জটিল অংশ এখনো পাকিস্তান। তুরস্ক বহু বছর ধরেই পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। সামরিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে কূটনৈতিক সমর্থন, দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সম্প্রতি দাবি করেছে, পাকিস্তান ভারতবিরোধী অভিযানে তুর্কি প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করেছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সব তথ্য নিশ্চিত হয়নি, তবু দিল্লির নিরাপত্তা মহলে এটি বড় একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সম্প্রতি সরাসরি বার্তা দিয়েছে, ‘সম্পর্ক পারস্পরিক সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।’ অর্থাৎ, দিল্লি পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, পাকিস্তানকে সমর্থন করতে থাকলে আঙ্কারার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সহজ হবে না।
তবু প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কেন এখন সম্পর্ক মেরামতের এই প্রচেষ্টা?
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে বদলে যাওয়া আঞ্চলিক বাস্তবতা কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ, গাজা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ, সব মিলিয়ে ভারত ও তুরস্ক দুই দেশই নিজেদের কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। তুরস্ক এখন শুধু পশ্চিমা জোটের ওপর নির্ভর করতে চায় না। আবার ভারতও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়। ফলে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখার সুযোগ কমে এসেছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্বের প্রশ্ন। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম বিশ্বের জনপ্রিয় নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ানোও সেই কৌশলের অংশ ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি জানেন, ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতি ও বাজারকে পুরোপুরি উপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত নয়।
ভারতের দিক থেকেও বাস্তবতা বদলেছে। দিল্লি এখন একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্য রাখতে চাইছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা কাতারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও তুরস্ককে পুরোপুরি দূরে ঠেলে দিলে আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে, এমন ধারণাও আছে ভারতীয় কৌশলবিদদের মধ্যে।
তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ মোটেও সহজ নয়। দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো গভীর। ভারতে এখনো তুরস্কবিরোধী জনমত রয়েছে ব্যাপকভাবে। আবার পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কও আগের মতোই শক্তিশালী। ফলে দিল্লি-আঙ্কারা সম্পর্কের এই নতুন উষ্ণতার সমীকরণ এখনো সতর্ক ও সীমিত পর্যায়েই রয়েছে।
কূটনীতির ভাষায় এটিকে অনেকে বলছেন, পুরোপুরি বন্ধুত্ব নয়, বরং প্রয়োজনের তাগিদে ধীরে ধীরে সম্পর্ক পুনর্গঠনের স্তরের দিকে যাত্রা।
দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনীতিতে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত, তুরস্ক ও পাকিস্তান, এই তিন দেশের সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুসলিম বিশ্বের রাজনীতি, চীনের প্রভাব, পশ্চিমা কূটনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎও।
সবশেষে বাস্তবতা হয়তো একটাই, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। আছে কেবল স্বার্থ, লাভালাভ এবং বদলে যাওয়া সময়েরই প্রয়োজনে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক
ইমেইল: [email protected]