বাংলাদেশের সংবিধানে সমতা ও সমঅধিকারের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকলেও বাস্তবে এখনো অনেক মানুষ প্রতিদিন বৈষম্যের শিকার হন। নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ নানা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমাজে বঞ্চনা, অসম আচরণ এবং ন্যায়বিচার ও সুযোগপ্রাপ্তিতে বাধার মুখোমুখি হন। সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতার কথা বললেও বাস্তব জীবনে সেই প্রতিশ্রুতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয় না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—সত্যিই কি দেশের সব নাগরিক আইনের চোখে সমান? নাকি সমাজের কাঠামোগত বৈষম্য এখনো নির্ধারণ করে দেয় কে অধিকার, সেবা ও মর্যাদা পাবে আর কে পাবে না?
সংবিধানে সমতার প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশের সংবিধান সমতার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতার কথা বলা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে, একই সঙ্গে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
এসব বিধান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ ন্যায়, মর্যাদা ও সমঅধিকারের রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
বাস্তবতা: প্রতিদিনের জীবনে বৈষম্য
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। সমাজের নানা স্তরে এখনো বৈষম্য বিদ্যমান। নারীরা কর্মক্ষেত্রে কম মজুরি, নেতৃত্বের কম সুযোগ, বৈষম্যমূলক আচরণ ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন। আইনি স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী শিক্ষা, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি সেবায় নানা বাধা ও সামাজিক অবহেলার মুখোমুখি হন।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতা ও সেবাপ্রাপ্তিতে বৈষম্যের শিকার হন। উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ভাষাগত ও ঐতিহাসিক কারণে প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা ও সীমিত সুযোগের কারণে পিছিয়ে পড়েন। আদিবাসী জনগোষ্ঠী ভূমির অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি ও উন্নয়ন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন।
দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠী, যাদের অনেকেই পরিচ্ছন্নতা বা ঐতিহ্যগত পেশার সঙ্গে যুক্ত, এখনো গভীর সামাজিক অবজ্ঞা ও শিক্ষা, বাসস্থান এবং সম্মানজনক কাজের সীমিত সুযোগের মধ্যে বসবাস করেন। এসব উদাহরণ দেখায় যে বৈষম্য শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি একটি কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা।
মৌলিক সেবায় প্রতিদিনের বঞ্চনা
বৈষম্যের প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও স্পষ্ট। স্বাস্থ্যসেবায় দলিত, হরিজন, বেদে সম্প্রদায়, চা শ্রমিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও হিজড়া জনগোষ্ঠী প্রায়ই হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অবহেলা ও অসম্মানের শিকার হন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও দলিত, হরিজন, বেদে ও হিজড়া জনগোষ্ঠী চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়েন। ফলে তারা স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। বাসস্থানের ক্ষেত্রেও সামাজিক কুসংস্কার ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে অনেক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিরাপদ ও উপযুক্ত আবাসন পান না।
শিক্ষাক্ষেত্রে সামাজিক কুসংস্কার, ভাষাগত বাধা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার অভাব ও দারিদ্র্য বৈষম্যকে আরও গভীর করে তোলে। এর ফলে মানসম্মত শিক্ষায় সমান সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বৈষম্য টিকে থাকে।
বিদ্যমান আইন: গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু যথেষ্ট নয়
বাংলাদেশ বৈষম্য মোকাবিলায় বিভিন্ন সময়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, গৃহসহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩। এছাড়া শ্রম, শিক্ষা ও নারী উন্নয়ন বিষয়ক বিভিন্ন নীতিমালাও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের কথা বলে।
তবে এসব আইন খণ্ডিত এবং নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সব ধরনের বৈষম্য মোকাবিলার জন্য এখনো একটি সমন্বিত ও বিস্তৃত আইনি কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বৈষম্যের সুস্পষ্ট ও একক সংজ্ঞা নেই, সব জনগোষ্ঠীর জন্য সমান সুরক্ষাও নিশ্চিত নয়। পাশাপাশি কার্যকর প্রতিকার ও বাস্তবায়নের শক্তিশালী ব্যবস্থাও অনুপস্থিত।
খসড়া আইন ও তার সীমাবদ্ধতা
এই দীর্ঘদিনের বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালে বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল। তবে এখনো আইনটি পাস হয়নি।
অনেক আইনবিদ ও মানবাধিকারকর্মীর মতে, খসড়া আইনে পরোক্ষ বা কাঠামোগত বৈষম্যের স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। এতে শক্তিশালী বাস্তবায়ন ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট শাস্তির বিষয়ও যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। এছাড়া সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ অভিযোগ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখনই কেন প্রয়োজন শক্তিশালী পদক্ষেপ
বাংলাদেশে বৈষম্য ও অসমতা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ছে। নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম ও মানবাধিকারকর্মীরা এখন আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষার দাবি তুলছেন।
সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানও মানুষের মধ্যে বৈষম্য, বঞ্চনা ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে গভীর অসন্তোষের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। এই আন্দোলনে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও সমঅধিকারের দাবিই ছিল অন্যতম প্রধান বার্তা। এটি দেখিয়েছে যে সমাজে একটি গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এছাড়া বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) প্রতিও অঙ্গীকারবদ্ধ। এসব প্রতিশ্রুতিতে বৈষম্য কমানো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বৈষম্য মোকাবিলায় ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। যুক্তরাজ্যে ইকুয়ালিটি অ্যাক্ট ২০১০ নামে একটি সমন্বিত আইন রয়েছে, যা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকাও একই ধরনের আইন অনুসরণ করে।
অন্যদিকে ভারত ও নেপালে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা আইন রয়েছে। পাকিস্তানে ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
এসব উদাহরণ দেখায় যে পদ্ধতি ভিন্ন হলেও একটি সমন্বিত আইন বৈষম্য মোকাবিলায় স্পষ্টতা, সামঞ্জস্য ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।
আইনের সমতা বাস্তব জীবনেও নিশ্চিত করতে হবে
বাংলাদেশের সংবিধানে সমতার শক্তিশালী প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো অনেক মানুষ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, চাকরি, বাসস্থান ও ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
খণ্ডিত আইন ও দুর্বল বাস্তবায়ন এই গভীর বৈষম্য দূর করার জন্য যথেষ্ট নয়। ২০২২ সালের খসড়া বৈষম্যবিরোধী আইন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও সেটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।
এখনই সময় বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, সমন্বিত ও কার্যকর বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন করার। এই আইনে সব ধরনের বৈষম্যের স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকতে হবে, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, সব ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দিতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের জন্য কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমতায় বিশ্বাস করে, তবে সেই সমতা মানুষের বাস্তব জীবনেও নিশ্চিত করতে হবে। একটি শক্তিশালী বৈষম্যবিরোধী আইন শুধু আইনি সংস্কার নয়, এটি ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অপরিহার্য পদক্ষেপ।
লেখক: লিড, ইয়ুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহিশন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
ইমেইল: [email protected]