পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র তার আপত্তির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, কিন্তু মার্কিন শর্ত মানতে রাজি হয়নি ইরান। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছেন, এর ফলে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে ইরান যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আলোচনা। অন্যদিকে উচ্চপর্যায়ের ওই আলোচনা শেষে এক বিবৃতিতে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত দাবি’ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিবৃতিতে এ কথা বলেছেন।
ইসলামাবাদে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা শেষ হওয়ার পর এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার ‘রেড লাইন’ বা যেসব শর্তে দেশটি ছাড় দিতে রাজি নয়, তা স্পষ্ট করেছে, কিন্তু ইরান ‘আমাদের শর্তে রাজি হয়নি’। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন কোনো অবস্থায় পৌঁছাতে পারিনি, যেখানে ইরানিরা আমাদের শর্তগুলো মেনে নেবে।’
ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এখন পাকিস্তান ছেড়ে দেশে ফিরে যাবেন বলেও জানান ভাইস প্রেসিডেন্ট তিনি। সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভ্যান্স ও মার্কিন কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ২১ ঘণ্টা ধরে এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু খারাপ খবর হলো, আমরা এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারিনি।’
ব্রিফিংয়ে ভ্যান্সের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জে ডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, ‘এই আলোচনার ফলাফল যাই হোক না কেন অথবা যে সীমাবদ্ধতাই থাকুক না কেন, এর জন্য পাকিস্তানিরা দায়ী নয়, বরং তারা অসাধারণভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন।’
যুক্তরাষ্ট্র সৎ উদ্দেশ্যেই এসেছিল: জে ডি ভ্যান্স
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এ আলোচনায় নমনীয় মনোভাব ও ‘সদিচ্ছা’ নিয়ে এসেছিল। তিনি বলেন, ‘কিন্তু ইরান মার্কিন শর্ত মেনে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু তেহরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার ব্যাপারে শক্ত অঙ্গীকার রয়েছে—সেটি দেখতে পারতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।’
ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা ইরানিদের সঙ্গে বেশ ফলপ্রসূ আলোচনা করেছি, সেটা আশার কথা। কিন্তু খারাপ খবর হলো, আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি। আর আমি মনে করি, এই ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি ক্ষতিকর।’
এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বন্ধ করাই যুক্তরাষ্ট্রের ‘মূল লক্ষ্য’ বলে জানিয়েছেন ভ্যান্স। ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সহজ কথা হলো, আমরা ইরানের কাছ থেকে এমন একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেখতে চাই যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং এমন কোনো সরঞ্জামও খুঁজবে না যা দিয়ে তারা দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে।’
এই বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘প্রধান লক্ষ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে’ বলেও দাবি করেন মার্কিন এই ভাইস প্রেসিডেন্ট। তবে তিনি এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন যে ইরান যাতে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সেজন্য তাদের পক্ষ থেকে ‘দৃঢ় মানসিক অঙ্গীকার’ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো সেই অঙ্গীকার দেখতে পাইনি। তবে ভবিষ্যতে তা দেখতে পাব বলে আমরা আশা করি।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওই বৈঠকে ইরানের জব্দ করা সম্পদ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ‘আমরা ওই সব বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছি’ উল্লেখ করে ভ্যান্স বলেন, ‘এর বাইরেও আরও অনেক বিষয়ে’ আলোচনা করেছি।
তিনি জানান, ‘আমরা এমন কোনো অবস্থায় পৌঁছাতে পারিনি যেখানে ইরানিরা আমাদের শর্তগুলো মেনে নিতে রাজি ছিল।’
এই আলোচনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা যথেষ্ট নমনীয় ছিলাম এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা আমাদের ছিল।’
অতিরিক্ত চাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত: ইরান
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এ আলোচনাকে ‘নিবিড়’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু চলমান আলোচনার সাফল্য ‘প্রতিপক্ষের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার উপর নির্ভর করে’ বলেও মন্তব্য করেছেন বাঘাই।
ওয়াশিংটনকে ‘অতিরিক্ত চাওয়া ও বেআইনি অনুরোধ’ করা থেকে বিরত থাকতে এবং ইরানের ‘বৈধ অধিকার ও স্বার্থ’ মেনে নিতেও আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের মুখপাত্র। তিনি জানান, যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ‘ইরানে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান’।
ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ হয়নি: নেতানিয়াহু
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, লেবাননের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য ‘অনুমোদন’ দিয়েছেন তিনি। এই বিবৃতিতে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান ‘এখনো শেষ হয়নি’ বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
‘আমরা এখনো তাদের বিরুদ্ধে লড়ছি’ উল্লেখ করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এখনো আরও অনেক কিছু করার আছে।’
ইসরায়েল এমন এক সময়ে এ বিবৃতি দিয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা পাকিস্তানে একটি শান্তি আলোচনার বৈঠকে ছিলেন। নেতানিয়াহু এই বিবৃতিতে সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের কিছু ‘সাফল্যের’ তালিকাও দেন। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান পাল্টাপাল্টি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলার ফলে অস্থির হয়ে পড়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রাখে, যা পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্যকে অস্থির করে তোলে। তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ হওয়ায় এর প্রভাব পড়ে তেল ও জ্বালানির বাজারে। অবশেষে গত ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের মধ্যস্ততায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়।