মার্কিন নৌবাহিনী উপসাগরে ইরানের একটি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আটক করেছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘তৌসকা’ নামের জাহাজটিকে থামার নির্দেশ দিলে সেটি তা অমান্য করে। তাই জাহাজটিকে জব্দ করা হয়। অন্যদিকে ইরান বলেছে, এটি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং তারা শিগগিরই এই সশস্ত্র জলদস্যুতার জবাব দিবে।
এ ঘোষণার আগে হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে পাকিস্তানে আয়োজিত দ্বিতীয় দফা আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তবে তেহরান এখনো দ্বিতীয় দফা আলোচনায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলতে থাকলে তারা আলোচনায় অংশ নেবে না।
ট্রাম্প স্থানীয় সময় রোববার (১৯ এপ্রিল) লিখেছেন, ‘আজ তৌসকা নামের প্রায় ৯০০ ফুট দীর্ঘ একটি ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আমাদের নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেটি তাদের জন্য ভালো হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, জাহাজটিকে থামার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু জাহাজটি তা মানেনি। ‘তাই আমাদের নৌবাহিনীর জাহাজ ইঞ্জিনরুমে গুলি চালিয়ে সেটিকে থামিয়ে দেয়।’
তিনি আরও দাবি করেন, ‘তৌসকা’ যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে এবং অতীতে অবৈধ কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত ছিল। ‘জাহাজটি এখন আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং আমরা এর ভেতরে কী আছে তা পরীক্ষা করছি।’
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড পরে একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে একটি নৌযানকে কার্গো জাহাজটি আটকাতে দেখা যায়। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, জাহাজটির দিকে একটি বন্দুক থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়ার এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ওমান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়েছে, এর নেভিগেশন ব্যবস্থা অচল করেছে এবং মেরিন মোতায়েন করে জাহাজে উঠেছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী খুব শিগগিরই মার্কিন নৌবাহিনীর এই ‘সশস্ত্র জলদস্যুতার জবাব দেবে।’
এদিকে ট্রাম্প শুক্রবার বলেন, দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ চালু থাকবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে সংঘাত শুরু হয় এবং পাঁচ সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলা চলার পর দুই সপ্তাহের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। এই মাসের শুরুর দিকে প্রথম দফা আলোচনা হয় এবং কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্প নৌ অবরোধের ঘোষণা দেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হবে বুধবার। ট্রাম্প রোববারের আগে জানিয়েছেন, তার প্রতিনিধিরা সোমবার পাকিস্তানে পৌঁছাবেন, যেখানে দেশটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স ছাড়াও ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ ও জারেদ কুশনার প্রতিনিধিদলে থাকবেন, যারা আগের আলোচনাতেও উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইরনা বলেছে, দ্বিতীয় দফায় আলোচনা হবে—এই খবর সত্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্র কেন হরমুজ প্রণালি অবরোধ করতে চায়
হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান ইরানকে যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে একে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে ইরান নিজের বাছাই করা দেশের জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে কার্যত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। তেহরান কিছু নির্দিষ্ট জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে বিশাল অংকের অর্থ আদায় করছে, অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের।
এ প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প ইরান সরকারের আয়ের একটি বড় উৎস বন্ধ করে দিয়েছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা, যদিও আবার এর ফলে তেল ও গ্যাসের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
ট্রাম্প এর আগে ফক্স নিউজকে বলেছেন, ‘ইরান তাদের পছন্দের লোকদের কাছে তেল বিক্রি করে টাকা আয় করবে আর অপছন্দের লোকদের কাছে বিক্রি করবে না—সেটা আমরা হতে দেব না।’
মার্কিন প্রসিডেন্ট আরও বলেছিলেন, তার লক্ষ্য হচ্ছে এটা নিশ্চিত করা যে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে ‘হয় সবাই পার হবে, নয়তো কেউই যেতে পারবে না’।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ট্রাম্পের এ বক্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত অনুযায়ী একটি চুক্তিতে আসতে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক টার্নার সিবিএসকে বলেছেন, এ অবরোধ পরিস্থিতি সমাধানের একটি পথ।