চুক্তি না হলে ইরান থেকে নৌ অবরোধ উঠবে না
যুদ্ধ অবসানে নতুন করে আলোচনা আদৌ শুরু হবে কিনা, তা নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত দেশটির বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে না যুক্তরাষ্ট্র। এক সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এই নৌ অবরোধ ‘ইরানকে একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে’ বলে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন ট্রাম্প। চলমান সংঘাতে তার দেশ ‘বড় ব্যবধানে’ জয়ী হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে বুধবার। পাকিস্তানে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় শান্তি আলোচনা শুরু হবে কিনা, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই ট্রাম্প এমন মন্তব্য করলেন। নতুন করে আলোচনা শুরু করার প্রত্যাশায় পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এখনো ওয়াশিংটন ছাড়েননি। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তারা বৈঠকে যোগ দেবে কিনা, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্যমতে, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ শুরু হওয়ার পর গত এক সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী ২৭টি জাহাজকে ঘুরিয়ে দিয়েছে বা ইরানের বন্দরে ফিরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। অবরোধ ভেঙে সামনে এগোনোর চেষ্টাকালে রোববার প্রথমবারের মতো ইরানের পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজকে আটকও করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে সেন্টকম। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন সেনারা ডেকে নামার আগে ইরানি জাহাজটিকে সতর্ক করছে। তবে এভাবে জাহাজ আটক করাকে তেহরান ‘জলদস্যুতা’ ও দুই দেশের মধ্যকার চলমান অস্থায়ী ‘যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির ওপর প্রায় দুই মাস ধরে অবরোধ বজায় রেখেছে ইরান। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। গত শনিবার অল্প সময়ের জন্য জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও তেহরানের হামলায় প্রণালিটির ভেতরে বা কাছাকাছি থাকা একটি তেলবাহী ট্যাংকারসহ বিভিন্ন জাহাজকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এরপর হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ হয়ে যায়।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ওইসব জাহাজে ‘গুলি চালিয়েছে’, যা চলমান যুদ্ধবিরতি ‘পূর্ণাঙ্গ লঙ্ঘন’। অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে শান্তি আলোচনার জন্য ইরান তাদের প্রতিনিধিদল পাঠাবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। চলতি মাসের শুরুতে প্রথম দফা শান্তি আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছিলেন, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারেনি, যেখানে ইরানিরা আমাদের শর্ত মেনে নিতে রাজি হবে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওয়াশিংটনকে ‘অতিরিক্ত দাবি ও বেআইনি অনুরোধ’ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল।
সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বৈঠকটি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সোমবার বিকেলে সূত্রগুলো বিবিসিকে জানায়, মার্কিন প্রতিনিধিদল ‘শিগগিরই’ ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা দেবে। তবে তারা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে কর্মকর্তারা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, তারা মঙ্গলবার যাবেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র সোমবার জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনায় যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তেহরানের ‘এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনা নেই’।
আগের দফার মতো এবারও জে ডি ভ্যান্সের সঙ্গে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার শান্তি আলোচনায় যোগ দেবেন বলে জানা যাচ্ছে। আর ইরানের পক্ষ থেকে কারা ওই বৈঠকে থাকবেন বা আদৌ কেউ যাবেন কিনা, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইসলামাবাদে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। ইসলামাবাদ শহরের সেরেনা হোটেল, যেখানে আগের দফায় শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, দ্বিতীয় দফার বৈঠকের প্রস্তুতির জন্য সেখানকার সাধারণ অতিথিদেরকে হোটেল ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে বিদেশি প্রতিনিধিদলের আগমন উপলক্ষ্যে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বন্ধ করে দিয়েছে পাকিস্তান পুলিশ। সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পাকিস্তান আত্মবিশ্বাসী যে তারা ইরানকে আলোচনার টেবিলে আসার বিষয়ে রাজি করাতে সক্ষম হবেন। রেডিও ফোরের পিএম অনুষ্ঠানে কথা বলতে গিয়ে তেহরানে অবস্থানরত বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিস ডুসেট বলেছেন, যদিও পরিস্থিতি অনিশ্চিত, তবুও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তিনি আরও বলেন, ‘কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি নিয়ম হলো, কোনো কিছু ভেস্তে যাওয়ার জন্য কেউই দায় নিতে চান না। যদি জে ডি ভ্যান্স ইসলামাবাদে যান, তাহলে ইরানিদের পক্ষে সেখানে উপস্থিত না হওয়াটা সত্যিই কঠিন হবে। আর আমার মনে হয়, উভয় দল যাতে সেখানে পৌঁছাতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য পাকিস্তানিরা টেলিফোনে অবিরামভাবে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ দ্বিতীয় দফায় শান্তি আলোচনার জন্য ইসলামাবাদ প্রস্তুত, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল পৌঁছানোর অপেক্ষা।’