ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গত ২২ এপ্রিল প্রাণ হারান আরও এক সাংবাদিক। নাম আমাল খলিল। তিনি ছিলেন লেবাননের নামকরা সাংবাদিক। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বিগত দখলদারিত্বের শুরুর বছরগুলোতে তার জন্ম।
বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও বোমাবর্ষণের মুখে দক্ষিণ লেবাননের মানুষের জীবনগাথা নথিভুক্ত করেছেন আমাল। লেবাননজুড়ে আমাল ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত এবং সবার প্রিয়। তার জানাজায় তার ভাই আলী খলিল বলেছিলেন, লেবাননের প্রতিটি ঘরে ছিল আমালের সরব উপস্থিতি।
বিগত দুই বছর ধরে আমাল ইসরায়েলি বাহিনীর কাছ থেকে সরাসরি হুমকি পেয়ে আসছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছিলেন মোসাদের এক এজেন্টের কথা, যিনি তাকে ফোন করে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, দক্ষিণ লেবাননে সাংবাদিকতা বন্ধ না করলে তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে।
ইসরায়েলিরা আমালের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি জানত। তারা চেয়েছিল আমাল যেন বোঝেন, তিনি নজরদারিতে আছেন। তা সত্ত্বেও আমাল তার কাজ করে গেছেন। এটা জানার পরও যেকোনো দিন ইসরায়েলি বাহিনী তাদের হুমকির বাস্তবায়ন ঘটাতে পারে।
আমাল ছিলেন সেই ধরনের মানুষ, যাদের ইসরায়েল সবচেয়ে বেশি ভয় পায়; যাকে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যায় না; যাকে কোনো কোণায় লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করা যায় না; যে প্রকাশ্যে ইসরায়েলের ক্ষমতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যে আমালকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করেছিল, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আমাল যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেই আল আখবার তার হত্যার ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ করেছে।
পত্রিকার তথ্যমতে, আমাল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর বিনত জবেইলের কাছে পেশাগত কাজে নিয়োজিত ছিলেন, যে শহর নিয়ে তিনি আগেও অনেক প্রতিবেদন করেছেন।
যুদ্ধবিরতির আগে ইসরায়েলি বাহিনী ও হিজবুল্লাহর মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাক্ষী ছিল এই বিনত জবেইল। এটি অনেক লেবানিজের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক। ২০০৬ সালের আগ্রাসনের সময় শহরটি সফলভাবে ইসরায়েলি বাহিনীর দখলের প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করেছিল।
ঘটনার দিন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী জয়নাব ফারাজের সঙ্গে একটি গাড়িতে ছিলেন আমাল। সেসময় তাদের সামনে আরেক গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা হয়। তখন তারা পাশের এক ভবনে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকে আত্মীয় ও সহকর্মীদের কাছে সাহায্যের জন্য ফোন করেন।
এর কিছুক্ষণ পরই ইসরায়েলি বাহিনী ওই ভবনটিতে বোমা হামলা চালায়। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রেডক্রসকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়ে একটি বিবৃতি দেন। রেডক্রসের একটি দল সেখান থেকে আহত জয়নাবকে উদ্ধার করতে পারলেও ইসরায়েলি বাহিনীর ভারী গুলিবর্ষণের কারণে আমালকে উদ্ধার করা যায়নি।
উদ্ধারকর্মীরা পরে যখন আবার ঘটনাস্থলে ফিরে যায়, তখন তারা আমালকে মৃত অবস্থায় পায়। এই হত্যাকাণ্ড ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও আল জাজিরার দীর্ঘদিনের প্রতিনিধি শিরিন আবু আকলেহর হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
চার বছর আগে শিরিনও ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক ফিলিস্তিনি শহর জেনিন থেকে প্রতিবেদন করছিলেন। এক সহকর্মীর সঙ্গে ইসরায়েলি গুলি থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নেওয়ার সময় তার মাথায় গুলি করা হয়।
শিরিনের হত্যার পর এখন পর্যন্ত ২৫০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী নিহত হয়েছেন; যার বেশিরভাগই গাজা গণহত্যার সময়। তাদের অনেককেই পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় লক্ষ্যবস্তু করা হয়। অন্যদিকে বাকিদের ওপর হামলা হয়েছে, যখন তারা তাদের পরিবারের সঙ্গে নিজ বাড়িতে ছিলেন।
যেমনটি ঘটেছিল মোহাম্মদ আবু হাতাবের ক্ষেত্রে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তার বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় পরিবারের ১১ জন সদস্যসহ হাতাব নিহত হন।
ফিলিস্তিন ও লেবাননের সাংবাদিকদের ইসরায়েলি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি প্রমাণিত। আমাল খলিলের হত্যাকাণ্ড সেই তালিকার সবশেষ সংযোজন, যা ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধকে ইতিহাসের যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
এই রেকর্ডের উল্লেখযোগ্য দিক কেবল এর বিশালতা নয়, বরং যে পরিস্থিতি এটিকে সম্ভব করেছে সেটি। বিচারহীনতা কেবল ঘটনার পরে বিচারের ব্যর্থতা নয়, বরং এটি এমন এক কাঠামো, যা কোনো বাহিনীকে আগে থেকেই মনে করতে শেখায়, তারা যা খুশি তা-ই করতে পারে।
ইসরায়েল দশকের পর দশক ধরে অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে, এমন কোনো কাজ নেই যা করলে তাদের পশ্চিমা সমর্থকদের সমর্থন হারাতে হবে। ইসরায়েলি শাসনকে কেবল ইতিহাসের অনন্য সহিংস ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আখ্যা দেওয়া ভুল হবে। সহিংসতার প্রকৃতি নয়, বরং যে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে তা পরিচালনা করা হচ্ছে, সেটি তাদের অন্য সবার থেকে আলাদা করে চেনাচ্ছে।
আর এই ঔদ্ধত্য মূলত বিচারহীনতার ফসল। এটি এমন এক শক্তি, যারা তাদের কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টাও এখন আর করে না। সাংবাদিকেরা কোনো ‘ক্রসফায়ারে’ পড়ে মারা যাচ্ছেন না; বরং তাদের খুঁজে খুঁজে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
এখানে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে তা আকস্মিক নয়, বরং এটিই তাদের মূল উদ্দেশ্য। আমাল তার জীবনের ঝুঁকি জানতেন। তবুও তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন, যেমনটা লেবানন ও ফিলিস্তিনের স্থানীয় সাংবাদিকেরা সবসময় নিয়ে আসছেন। কারণ কাউকে না কাউকে তো সেখানকার মানুষের ওপর যা ঘটছে, তার সাক্ষী থাকতে হবে।
ইসরায়েলি বাহিনী আমালকে হত্যার মাধ্যমে সেই সাক্ষ্যের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছে। মুক্ত গণমাধ্যমের কথা বলা এই বিশ্ব শিরিনের মতো আমালকেও হয়তো ক্ষণিকের জন্য স্মরণ করবে, কিন্তু এরপর ঠিকই আবার সেই দায়মুক্তি দেবে, যা পরবর্তী হত্যাকাণ্ডকে অনিবার্য করে তুলবে।
ইয়ারা হাওয়ারি ফিলিস্তিনি নীতি নির্ধারণী নেটওয়ার্ক আল-শাবাকার সহ-পরিচালক
আল জাজিরা থেকে নেওয়া