ভারতের দক্ষিণী চলচ্চিত্রের সুপারস্টার ও রাজনীতিবিদ থালাপতি বিজয়। রুপালি পর্দার রোমান্টিক ও অ্যাকশন হিরোর রোল থেকে তিনি এখন বাস্তব জীবনের হিরোতে পরিণত হয়েছেন। তিনি এবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথে বেশ জোরালোভাবেই এগিয়ে চলছেন।
২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার সর্বশেষ প্রবণতা অনুযায়ী, বিজয়ের নবগঠিত দল ‘তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম’ (টিভিকে) রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছে।
সোমবার (৪ মে) প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, প্রথমবার নির্বাচনে নেমেই বিজয়ের দল ১০১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে, যা রাজ্যটির প্রথাগত দুই প্রধান শক্তি এআইএডিএমকে (৭৮ আসন) এবং বর্তমান শাসক দল ডিএমকে-কে (৫০ আসন) অনেকটা কোণঠাসা করে ফেলেছে।
তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসনের ম্যাজিক সংখ্যার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থানকে এখন আর কেবল তারকাখ্যাতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তিনি নিজে পেরাম্বুর এবং তিরুচিরাপল্লি (পূর্ব) এই দুটি হেভিওয়েট আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা ১৯৯১ সালে প্রয়াত নেত্রী জয়ললিতার দ্বৈত আসনে লড়ার কৌশলের কথা মনে করিয়ে দেয়।
নির্বাচনী প্রচারণায় বিজয় নিজেকে তামিল এলাকার প্রত্যেক পরিবারের সদস্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সাধারণ মানুষের আবেগকে তিনি স্পর্শ করতে পেরেছেন। তিনি বর্তমান শাসক দল ডিএমকে-কে উৎখাত করতে বাঁশির বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন, যা বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
যদিও রাজনৈতিক ময়দানে তার পদার্পণ খুব একটা মসৃণ ছিল না; বিশেষ করে ২০২৫ সালের নির্বাচনী প্রচারে কারুর এলাকায় পদদলিত হয়ে বহু মানুষ হতাহত হয়। এ সংক্রান্ত তদন্ত এবং ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী সঙ্গীতার সঙ্গে বিচ্ছেদের গুঞ্জন তাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। তবে বিজেপিকে আদর্শগত শত্রু এবং ডিএমকে-কে রাজনৈতিক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে কোনো জোটে না গিয়ে একা লড়ার যে দুঃসাহস তিনি দেখিয়েছেন, নির্বাচনের ফলাফল তার সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
৬২৪ কোটি রুপির বিশাল সম্পদ নিয়ে এবারের নির্বাচনের অন্যতম ধনী প্রার্থী বিজয় তার নির্বাচনী ইশতেহারে সাধারণ মানুষের জন্য একগুচ্ছ জনতুষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বেকার স্নাতকদের জন্য মাসে ৪ হাজার রুপি ভাতা, নারীদের জন্য ২ হাজার ৫০০ রুপি আর্থিক সহায়তা এবং বিয়ের উপহার হিসেবে সোনা ও শাড়ি প্রদান। পাশাপাশি সরকারি পরীক্ষাগুলো নির্দিষ্ট সময়ে নেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি কর্মসংস্থান প্রত্যাশীদের আস্থাও অর্জন করেছেন।
তামিলনাড়ুর রাজনীতির ইতিহাসে রূপালি পর্দা থেকে এসে মসনদে বসার এই প্রবণতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। বিজয়ের এই যাত্রা মনে করিয়ে দেয় কিংবদন্তি অভিনেতা এম. জি. রামচন্দ্রন (এমজিআর)-এর কথা, যিনি সিনেমার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় দাপটের সঙ্গে শাসন করেছিলেন।
একইভাবে শিবাজি গণেশন রাজনীতিতে প্রভাব রাখার চেষ্টা করেছিলেন, আর এন. টি. রামা রাও অন্ধ্রপ্রদেশের রাজনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে জয়ললিতা সিনেমার গ্ল্যামার আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মিশেলে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
সমসাময়িক কালে কমল হাসান কিংবা রজনীকান্ত রাজনীতিতে আসার ঘোষণা দিলেও থালাপতি বিজয়ের মতো এত বড় মাপের নির্বাচনী সাফল্য বা চমক দেখাতে পারেননি। বিজয়ের এই উত্থান মূলত তামিলনাড়ুর দীর্ঘদিনের দ্বিমুখী রাজনৈতিক ধারাকে (ডিএমকে ও এআইএডিএমকে) ভেঙে দিয়ে একটি শক্তিশালী ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি করেছে। যদি শেষ পর্যন্ত বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন, তবে তা ভারতের ইতিহাসে চলচ্চিত্র থেকে রাজনীতিতে আসা তারকাদের সাফল্যের মুকুটে এক নতুন পালক যোগ করবে।