ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট নতুন একটি বিতর্কিত আইন পাস করেছে, যার মাধ্যমে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত অভিযোগে আটক ফিলিস্তিনিদের জন্য বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। এই আইনের আওতায় দোষী সাব্যস্ত হলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। আইনটি সোমবার বিপুল সমর্থনে পাস হয়। ১২০ সদস্যের নেসেটে পক্ষে ভোট পড়ে ৯৩টি, বিপক্ষে কেউ ভোট দেননি।
নতুন এই ট্রাইব্যুনাল বসবে জেরুজালেমে। সেখানে আটক হামাস যোদ্ধা ও অভিযুক্তদের বিচার হবে প্রকাশ্যে। আদালতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন শুনানি, রায় ঘোষণা ও সাজা ভিডিও করে জনসমক্ষে প্রচার করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ইসরায়েলি সরকার বলছে, ৭ অক্টোবরের হামলার ভয়াবহতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই আইনকে ঐতিহাসিক হিসেবে বর্ণনা করছেন। দেশটির বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন বলেছেন, এটি নেসেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তার দাবি, হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘কঠোরতম শাস্তি’ নিশ্চিত করতেই এই আইন আনা হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং দুই শতাধিককে জিম্মি করা হয়। এরপর গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সেই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বড় অংশ নারী ও শিশু।
ইসরায়েলের দাবি, হামলায় অংশ নেওয়া কয়েকশ যোদ্ধাকে আটক করা হয়েছে। বিশেষ করে হামাসের নুখবা ইউনিটের সদস্যদের বিচারের জন্যই এই নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
তবে আইনটি ঘিরে ইতোমধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি মূলত শো ট্রায়াল বা জনমত তৈরির বিচার ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, নির্যাতন বা জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তিকেও আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হতে পারে।
ইসরায়েলের মানবাধিকার সংগঠন আদালাহর আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ আল জাজিরাকে বলেছেন, এই আইন আন্তর্জাতিক আইনের ন্যূনতম মানদণ্ডও পূরণ করে না। তার অভিযোগ, এতে নিরপেক্ষ বিচার ও নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আরেকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে। ইসরায়েলে মৃত্যুদণ্ড কার্যত প্রায় বিলুপ্ত। দেশটির ইতিহাসে মাত্র একবারই আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল, সেটি ১৯৬২ সালে নাৎসি কর্মকর্তা অ্যাডলফ আইখম্যানকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এবার নতুন আইনের মাধ্যমে বহু বছর পর আবারও মৃত্যুদণ্ডের বাস্তব আশঙ্কা তৈরি হলো।
এর আগে চলতি বছরের মার্চেও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আরেকটি আইন পাস করেছিল নেসেট। সেই আইনে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলিদের হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য ফাঁসিকে ডিফল্ট শাস্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
হামাস এই নতুন আইনকে ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধ আড়াল করার চেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যুর মধ্যে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে নতুন রাজনৈতিক নাটক সাজাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশও বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে প্রকাশ্য সামরিক ট্রাইব্যুনাল এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ নিয়েও শুনানি চলছে।
সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা, দ্য জেরুজালেম পোস্ট ও প্রেস টিভি