বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একটি এনভিডিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিস্ফোরক উত্থানের পর এই প্রতিষ্ঠানটি এখন কার্যত বৈশ্বিক প্রযুক্তি যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে। সেই এনভিডিয়ার জন্য এবার বড় ধরনের ছাড় দিল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সরকার চীনের প্রায় ১০টি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে এনভিডিয়ার উচ্চক্ষমতার এইচ-২০০ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ কেনার অনুমোদন দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আলিবাবা, টেনসেন্ট, বাইটড্যান্স, জেডি ডটকমের মতো চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো। এছাড়া লেনোভো ও ফক্সকনের মতো প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও এই তালিকায় রয়েছে।
তবে অনুমোদন মিললেও এখনো পর্যন্ত একটি চিপও চীনে সরবরাহ করা হয়নি। কারণ, পুরো বিষয়টি এখনো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে আটকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে চীনও চাইছে নিজেদের প্রযুক্তি খাতকে বিদেশি নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে। ফলে দুই দেশের টানাপোড়েনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এনভিডিয়ার মতো কোম্পানিগুলো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যবসায়িক অনুমোদন নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি সম্পর্কের নতুন ইঙ্গিত। গত কয়েক বছর ধরে ওয়াশিংটন চীনের কাছে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল, এসব চিপ সামরিক প্রযুক্তি ও নজরদারি ব্যবস্থায় ব্যবহার হতে পারে। ফলে এনভিডিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী চিপগুলোর রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর বড় ধাক্কা লাগে কোম্পানিটির চীনা বাজারে। একসময় চীনের উন্নত এআই চিপ বাজারে এনভিডিয়ার অংশ ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার পর সেই অবস্থান দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন, চীনকে পুরোপুরি প্রযুক্তি বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে। তার মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে প্রযুক্তি বিক্রি না করে, তাহলে চীন নিজেদের বিকল্প প্রযুক্তি আরও দ্রুত তৈরি করবে। ইতোমধ্যে হুয়াওয়ে ও ডিপসিকের মতো চীনা প্রতিষ্ঠান নিজেদের এআই চিপ ও ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল তৈরিতে বড় অগ্রগতি দেখিয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের আওতায় থাকা প্রতিটি চীনা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার পর্যন্ত এইচ-২০০ চিপ কিনতে পারবে। ধারণা করা হচ্ছে, সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে অর্ডার দিলে মোট চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ চিপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে এনভিডিয়ার আয় ও বাজারমূল্যে বড় প্রভাব পড়বে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরে গেছেন এবং সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করছেন। সফরের শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের প্রতিনিধি দলে যোগ দেন এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াং। এতে জল্পনা শুরু হয় যে, চিপ রপ্তানি ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে কোনো সমঝোতার চেষ্টা চলছে কি না।
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভিকে দেওয়া এক বক্তব্যে জেনসেন হুয়াং বলেন, তিনি আশা করছেন ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত করতে সহায়তা করবে। তার ভাষায়, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর।
তবে পুরো পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চয়তায় ভরা। কারণ, চীনা সরকার নিজেদের প্রযুক্তি শিল্পকে শক্তিশালী করতে বিদেশি চিপের ওপর নির্ভরতা কমানোর নীতি নিয়েছে। অনেক চীনা কোম্পানি এখন অপেক্ষা করছে, বেইজিং শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র অনুমতি দিলেও বাস্তবে চিপ সরবরাহ কবে শুরু হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি যুদ্ধ এখন আর শুধু মোবাইল বা সফটওয়্যারের লড়াই নয়। এটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের লড়াই। আর সেই যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে উচ্চক্ষমতার চিপ। এনভিডিয়ার এইচ-২০০ চিপ মূলত বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ, ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামরিক সিমুলেশন এবং উন্নত গণনাভিত্তিক গবেষণায় ব্যবহৃত হয়। ফলে এই চিপকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স ও মার্কেট ওয়াচ